লেখক :-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
লেখকের পরিচিত :- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়; ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামেও স্বাক্ষর করতেন; ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০ – ২৯ জুলাই ১৮৯১) ঊনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য সংস্কৃত কলেজ থেকে ১৮৩৯ সালে তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। আরো পডুন
বেলা ছয় সাত ঘণ্টার সময়, নবাব, সেনাপতি মানিকচাঁদের হস্তে দুর্গ সমর্পণ করিয়া, শিবিরে গমন করিলেন। সমূদয়ে এক শত ছচল্লিশ জন য়ুরোপীয় বন্দী ছিল। সেনাপতি সে রাত্রি তাহাদিগকে যেখানে রাখিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন, এমন স্থানের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। তৎকালে দুর্গের মধ্যে, দীর্ঘে বারো হাত, প্রস্থে নয় হাত, এরূপ এক গৃহ ছিল। বায়ুসঞ্জারের নিমিত্ত, ওই গৃহের এক এক দিকে এক এক মাত্র গবাক্ষ থাকে। ইংরেজেরা কলহকারী দুর্বৃত্ত সৈনিকদিগকে ওই গৃহে রুদ্ধ করিয়া রাখিতেন। নবাবের সেনাপতি, দারুণ গ্রীষ্মকালে, সমস্ত য়ুরোপীয় বন্দীদিগকে ওই ক্ষুদ্র গৃহে নিক্ষিপ্ত করিলেন।
সে রাত্রিতে যন্ত্রণার পরিসীমা ছিল না। বন্দীরা, অতি ত্বরায়, ঘোরতর পিপাসায় কাতর হইল। তাহারা, রক্ষকদিগের নিকট বারংবার প্রার্থনা করিয়া যে জল পাইল, তাহাতে কেবল তাহাদিগকে ক্ষিপ্তপ্রায় করিল। প্রত্যেক ব্যক্তি, সম্যকরূপে নিশ্বাস আকর্ষণ করিবার আশায়, গবাক্ষের নিকটে যাইবার নিমিত্ত, বিবাদ করিতে লাগিল; এবং, যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া, রক্ষীদিগের নিকট প্রার্থনা করিতে লাগিল, তোমরা, গুলি করিয়া, আমাদের এই দুঃসহ যন্ত্রণার অবসান করো। এক এক জন করিয়া, ক্রমে ক্রমে, অনেকে পঞ্চত্ব পাইয়া ভূতলশায়ী হইল। অবশিষ্ট ব্যক্তিরা শবরাশির উপর দাঁড়াইয়া, নিশ্বাস আকর্ষণের অনেক স্থান পাইল, এবং তাহাতেই কয়েকজন জীবিত থাকিল।
পরদিন প্রাতঃকালে ওই গৃহের দ্বার উদ্ঘাটিত হইলে, দৃষ্ট হইল, এক শত ছচল্লিশের মধ্যে, তেইশ জন মাত্র জীবিত আছে। অন্ধকূপহত্যা নামে যে অতি ভয়ঙ্কর ব্যাপার প্রসিদ্ধ আছে, সে এই। এই হত্যার নিমিত্তই, সিরাজউদ্দৌলার কলিকাতা আক্রমণ শুনিতে এত ভয়ানক হইয়া রহিয়াছে, উক্ত ঘোরতর অত্যাচার প্রযুক্তই, এই বৃত্তান্ত লোকের অন্তঃকরণে অদ্যাপি দেদীপ্যমান আছে, এবং সিরাজউদ্দৌলাও নৃশংস রাক্ষস বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। কিন্তু তিনি, পরদিন প্রাতঃকাল পর্যন্ত, এই ব্যাপারের বিন্দুবিসর্গ জানিতেন না। সে রাত্রিতে, সেনাপতি মানিকচাদের হস্তে দুর্গের ভার অর্পিত ছিল; অতএব, তিনিই সমস্ত দোষের ভাগী।
২১ জুন, প্রাতঃকালে, এই নিদারুণ ব্যাপার নবাবের কর্ণগোচর হইলে তিনি অতিশয় অনবধান প্রদর্শন করিলেন। অন্ধকূপে রুদ্ধ হইয়া, যে কয় ব্যক্তি জীবিত থাকে, হলওয়েল সাহেব তাহাদের মধ্যে একজন। নবাব, তাঁহাকে আহ্বান করিয়া ধনাগার দেখাইয়া দিতে কহিলেন। তিনি দেখাইয়া দিলেন; কিন্তু ধনাগারের মধ্যে পঞ্চাশ সহস্রের অধিক টাকা পাওয়া গেল না।
সিরাজউদ্দৌলা, নয় দিবস, কলিকাতার সান্নিধ্যে থাকিলেন; অনন্তর, কলিকাতার নাম আলীনগর রাখিয়া, মুরশিদাবাদ প্রস্থান করিলেন। ২ জুলাই, গঙ্গা পার হইয়া তিনি হুগলীতে উত্তীর্ণ হইলেন, এবং লোক দ্বারা ওলন্দাজ ও ফরাসিদিগের নিকট কিছু কিছু টাকা চাহিয়া পাঠাইলেন। তিনি তাঁহাদিগকে এই বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিলেন, যদি অস্বীকার কর, তোমাদেরও ইংরেজদের মত দুরবস্থা করিব। তাহাতে ওলন্দাজেরা সাড়ে চারি লক্ষ, আর ফরাসিরা সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দিয়া পরিত্রাণ পাইলেন।
যে বৎসর কলিকাতা পরাজিত হইল, ও ইংরেজেরা বাংলা হইতে দুরীকৃত হইলেন, সেই বৎসর, অর্থাৎ ১৭৫৬ খ্রি. অব্দে, দিনামারেরা, এই দেশে বাসের অনুমতি পাইয়া শ্রীরামপুর নগর সংস্থাপিত করিলেন।
সিরাজউদ্দৌলা, জয়লাভে প্রফুল্ল হইয়া, পূর্ণিয়ার অধিপতি পিতৃব্যপুত্র সতঙ্গকে আক্রমণ করা স্থির করিলেন। বিবাদ উত্থাপন করিবার নিমিত্ত, আপন এক ভৃত্যকে ওই প্রদেশের ফৌজদার নিযুক্ত করিয়া, পিতৃব্যপুত্রকে এই আজ্ঞাপত্ৰ লিখিলেন, তুমি অবিলম্বে ইহার হস্তে সমস্ত বিষয়ের ভার দিবে। ওই উদ্ধত যুবা, পত্র পাঠে ক্রোধান্ধ ও ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া, উত্তর লিখিলেন, আমি সমস্ত প্রদেশের যথার্থ অধিপতি, দিল্লি হইতে সনন্দ পাইয়াছি; অতএব, আজ্ঞা করিতেছি, তুমি অবিলম্বে মুরশিদাবাদ হইতে চলিয়া যাও।
এই উত্তর পাইয়া, সিরাজউদ্দৌলা, ক্রোধে অধৈর্য হইলেন, এবং অতি ত্বরায়, সৈন্য সংগ্রহ করিয়া পূর্ণিয়া যাত্রা করিলেন। সকতজঙ্গও, এই সংবাদ পাইয়া সৈন্য লইয়া, তদভিমুখে আগমন করিতে লাগিলেন। কিন্তু সকতজঙ্গ নিজে যুদ্ধের কিছুই জানিতেন না, এবং কাহারও পরামর্শ শুনিতেন না। তাঁহার সেনাপতিরা সৈন্য সহিত এক দৃঢ় স্থানে উপস্থিত হইল। ওই স্থানের সম্মুখে জলা, পার হইবার নিমিত্ত মধ্যে এক মাত্র সেতু ছিল। সৈন্য সকল সেই স্থানে শিবির সন্নিবেশিত করিল। কিন্তু তদীয় সৈন্য মধ্যে, এক ব্যক্তিও উপযুক্ত সেনাপতি পার্টি ছিল না।
প্রত্যেক সেনাপতি আপন আপন সুবিধা অনুসারে, পৃথক পৃথক স্থানে সেনাপতি নিবেশিত করিলেন।
সিরাজউদ্দৌলার সৈন্য, ওই জলার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সতজঙ্গের সৈন্যের উপর গোলা চালাইতে লাগিল। বড়ো বড়ো কামানের গোলাতে তদীয় সৈন্য ছিন্নভিন্ন হইলে, তিনি নিতান্ত উন্মত্তের ন্যায়, স্বীয় অশ্বারোহীদিগকে, জলা পার হইয়া, বিপক্ষ সৈন্য আক্রমণ করিতে আজ্ঞা দিলেন। তাহারা অতি কষ্টে কর্দম পার হইয়া, শুষ্ক স্থানে উপস্থিত হইবা মাত্র, সিরাজউদ্দৌলার সৈন্য অতি ভয়ানক রূপে তাহাদিগকে আক্রমণ করিল।
ঘোরতর যুদ্ধ হইতেছে, এমন সময়ে, সকতঙ্গ স্বীয় শিবিরে প্রবেশ করিলেন, এবং, অত্যধিক সুরাপান করিয়া, এমন মত্ত হইলেন যে, আর সোজা হইয়া বসিতে পারেন না। তাঁহার সেনাপতিরা আসিয়া তাঁহাকে, রণস্থলে উপস্থিত থাকিবার নিমিত্ত, অতিশয় অনুরোধ করিতে লাগিলেন; পরিশেষে ধরিয়া থাকিবার নিমিত্ত এক ভৃত্যসমেত, তাঁহাকে হস্তীতে আরোহণ করাইয়া, জলার প্রান্তভাগে উপস্থিত করিলেন। তথায় উপস্থিত হইবামাত্র, শত্রুপক্ষ হইতে এক গোলা আসিয়া তাঁহার কপালে লাগিল। তিনি তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সৈন্যেরা, তাঁহাকে প্রাণত্যাগ করিতে দেখিয়া, শ্রেণিভঙ্গপূর্বক পলায়ন করিল। দুই দিবস পরে, নবাবের সেনাপতি মোহনলাল পূর্ণিয়া অধিকার করিলেন, এবং তথাকার ধনাগারে প্রাপ্ত ন্যূনাধিক নবতি লক্ষ টাকা ও সকভজঙ্গের যাবতীয় অন্তঃপুরিকাগণ মুরশিদাবাদে পাঠাইয়া দিলেন।
