পথের দাবি ( Pathera Dabi) দশম শ্রেণীর বাংলা কবিতা ।। class x bangali golpo ।। সাহিত্য সঞ্চয়ন দশম শ্রেণী উৎস সন্ধানে

পথের দাবি দশম শ্রেণীর বাংলা গল্প।। class x bangali golpo ।। সাহিত্য সঞ্চয়ন দশম শ্রেণী উৎস সন্ধানে ।

  


ছবি :- পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পাঠ্যপুস্তক


          লেখক:- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্য


শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ – ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮) ছিলেন একজন বাঙালি লেখক, ঔপন্যাসিক, ও গল্পকার। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় এবং বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। তার অনেক উপন্যাস ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে।লেখকের সমন্ধে আরো পড়ুন




পুলিশ - স্টেশনে প্রবেশ করিয়া দেখা গেল , সুমুখের হলঘরে জন - ছয়েক বাঙালি মােট - ঘাট লইয়া বসিয়া আছে , জগদীশবাবু ইতিমধ্যেই তাহাদের টিনের তোরঙ্গ ও ছোটো - বড়াে পুঁটলি খুলিয়া তদারক শুরু করিয়া দিয়াছেন । শুধু যে লােকটির প্রতি তাঁহার অত্যন্ত সন্দেহ হইয়াছে তাহাকে আর একটা ঘরে আটকাইয়া রাখা হইয়াছে । ইহারা সকলেই উত্তর - ব্রহ্মে বর্মা - অয়েল - কোম্পানির তেলের খনির কারখানায় মিস্ত্রির কাজ করিতেছিল , সেখানের জলহাওয়া সহ্য না হওয়ায় চাকরির উদ্দেশে রেঙ্নুগে চলিয়া আসিয়াছে । ইহাদের নাম ধাম ও বিবরণ লইয়া ও সঙ্গের জিনিসপত্রের পরীক্ষা করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইলে , পােলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে নিমাইবাবুর সম্মুখে হাজির করা হইল । লােকটি কাশিতে কাশিতে আসিল । অত্যন্ত ফরসা রং রৌদ্রে পুড়িয়া যেন তামাটে হইয়াছে । বয়স ত্রিশ - বত্রিশের অধিক নয় , কিন্তু ভারী রােগা দেখাইল । এইটুকু কাশির পরিশ্রমেই সে হাঁপাইতে লাগিল । সহসা আশঙ্কা হয় , সংসারের মিয়াদ বােধ করি বেশি দিন নাই ; ভিতরের কী একটা দুরারােগ্য রােগে সমস্ত দেহটা যেন দ্রুতবেগে ক্ষয়ের দিকে ছুটিয়াছে । কেবল আশ্চর্য সেই রােগা মুখের অদ্ভুত দুটি চোখের দৃষ্টি । সে চোখ ছােটো কি বড়াে , টানা কি গােল , দীপ্ত কি প্রভাহীন এ - সকল বিবরণ দিতে যাওয়াই বৃথা — অত্যন্ত গভীর জলাশয়ের মতাে কী যে তাহাতে আছে , ভয় হয় এখানে খেলা চলিবে না , সাবধানে দুরে দাঁড়ানােই প্রয়ােজন । ইহারই কোন অতল তলে তাহার ক্ষীণ প্রাণশক্তিটুকু লুকানাে আছে , মৃত্যুও সেখানে প্রবেশ করিতে সাহস করে না । কেবল এই জন্যই যেন সে আজও বাঁচিয়া আছে । অপূর্ব মুগ্ধ হইয়া সেইদিকে চাহিয়া ছিল , সহসা নিমাইবাবু তাহার বেশভূষার বাহার ও পারিপাট্যের প্রতি অপূর্বর দৃষ্টি আকৃষ্ট করিয়া সহাস্যে । কহিলেন , বাবুটির স্বাস্থ্য গেছে , কিন্তু শখ যােলােআনাই বজায় আছে তা স্বীকার করতে হবে। কী বল অপূর্ব ?

এতক্ষণে অপূর্ব তাহার পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া মুখ ফিরাইয়া হাসি গােপন করিল । তাহার মাথার সম্মুখদিকে বড়াে বড়াে চুল , কিন্তু ঘাড় ও কানের দিকে নাই বলিলেই চলে , —এমনি ছােটো করিয়া ছাঁটা । মাথায় চেরা সিঁথি , অপর্যাপ্ত তৈলনিষিক্ত , কঠিন , রুগ্ন , কেশ হইতে নিদারুণ নেবুর তেলের গন্ধে ঘর ভরিয়া উঠিয়াছে । গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি , তাহার বুক - পকেট হইতে বাঘ - আঁকা একটা রুমালের কিয়দংশ দেখা যাইতেছে , উত্তরীয়ের কোনাে বালাই নাই । পরনে বিলাতি মিলের কালাে মখমল পাড়ের সুক্ষ্ম শাড়ি , পায়ে সবুজ রঙের ফুল মােজা - হাঁটুর উপরে লাল ফিতা দিয়া বাঁধা , বানিশ - করা পাম্প শু , তলাটা মজবুত ও টিকসই করিতে আগাগােড়া লােহার নাল বাঁধানাে , হাতে একগাছি হরিণের শিঙের হাতল দেওয়া বেতের ছড়ি , কয়দিনের জাহাজের ধকলে সমস্তই নোংরা হইয়া উঠিয়াছে , ইহার আপাদমস্তক অপূর্ব বারবার নিরীক্ষণ করিয়া কহিল , কাকাবাবু , এ লােকটিকে আপনি কোনাে কথা জিজ্ঞেস না করেই ছেড়ে দিন , যাকে খুঁজছেন সে যে এ নয় , তার আমি জামিন হতে পারি । 
নিমাইবাবু চুপ করিয়া রহিলেন । অপূর্ব কহিল , আর যাই হােক , যাকে খুঁজছেন তার কালচরের কথাটা একবার ভেবে দেখুন ।
 
নিমাইবাবু হাসিয়া ঘাড় নাড়িলেন , কহিলেন , তােমার নাম কী হে ? 

আজ্ঞে , গিরীশ মহাপাত্র । 



একদম মহাপাত্র ! তুমিও তেলের খনিতেই কাজ করছিলে , না ? এখন রেঙ্গুনেই থাকবে ? তােমার বাক্স বিছানা তাে খানাতল্লাশি হয়ে গেছে , দেখি তােমার টাকে এবং পকেটে কী আছে ?

তাহার ট্যাক হইতে একটি টাকা ও গণ্ডা - ছয়েক পয়সা বাহির হইল , পকেট হইতে একটা গোহার কম্পাস , মাপ করিবার কাঠের একটা ফুটরুল , কয়েকটা বিডি , একটা দেশলাই ও একটা গাঁজার কলিকা বাহির হইয়া পড়িল । 

নিমাইবাবু কহিলেন , তুমি গাঁজা খাও ? 

লােকটি অসঙ্কোচে জবাব দিল , আজ্ঞে না । 

তবে এ বস্তুটি পকেটে কেন ? 

আজ্ঞে , পথে কুড়িয়ে পেলাম , যদি কারও কাজে লাগে তাই তুলে রেখেছি । 


জগদীশবাবু এই সময়ে ঘরে ঢুকিতে নিমাইবাবু হাসিয়া কহিলেন , দেখাে জগদীশ , কীরূপ সদাশয় ব্যক্তি ইনি । যদি কারও কাজে লাগে তাই গাঁজার কলকেটি কুড়িয়ে পকেটে রেখেছেন । ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া কহিলেন , গাঁজা খাবার সমস্ত লক্ষণই তােমাতে বিদ্যমান বাবা , বললেই পারতে , খাই । কিন্তু কদিনই বা বাঁচাবে , এই তাে তােমার দেহ , আর খেয়াে না । বুড়োমানুষের কথাটা শুনাে। 
মহাপাত্র মাথা নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিল , আজ্ঞে না মাইরি খাইনে । তবে ইয়ার বন্ধু কেউ তৈরি করে । দিতে বললে দিই , এই মাত্র ! নইলে নিজে খাইনে । 

জগদীশবাবু চটিয়া উঠিয়া কহিলেন , দয়ার সাগর! পরাকে সেজে পি , নিজে খাইনে । মিথ্যেবাদী কোথাকার ! 

অপূর্ব কহিল , বেলা হয়ে গেল , আমি এখন তবে চললুম কাকাবাবু । 

নিমাইবাবু উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন , আচ্ছা , তুমি এখন যেতে পারাে মহাপাত্র ! কী বল জগদীশ , পারে তাে ? জগদীশ সম্মতি জানাইলে কহিলেন , কিন্তু নিশ্চয় কিছুই বলা যায় না ভায়া , আমার মনে হয় এ শহরে আরও কিছুদিন নজর রাখা দরকার । রাত্রের মেল ট্রেনটার প্রতি একটু দৃষ্টি রেখাে , সে যে বর্মায় এসেছে এ খবর সত্য ।
 
জগদীশ কহিলেন , তা হতে পারে , কিন্তু এই জানােয়ারটাকে ওয়াচ করবার দরকার নেই বড়ােবাবু । নেবুর তেলের গন্ধে ব্যাটা থানাসুদ্ধ লােকের মাথা ধরিয়ে দিলে ! বড়ােবাবু হাসিতে লাগিলেন । অপূর্ব পুলিশ - স্টেশন হইতে বাহির হইয়া আসিল , এবং প্রায় তাহার সঙ্গে সঙ্গেই মহাপাত্র তাহার ভাঙা টিনের তোরা ও চাটাই - জড়ানাে ময়লা বিছানার বান্ডিল বগলে চাপিয়া ধীর মন্থরপদে উত্তর দিকের রাস্তা ধরিয়া সােজা প্রস্থান করিল । 

আশ্চর্য এই যে , এত বড়াে সব্যসাচী ধরা পড়িল না, কোনাে দুর্ঘটনা ঘটিল না এমন সৌভাগ্যকেও অপূর্বর মন যেন গ্রাহ্যই করিল না । বাসায় ফিরিয়া দাড়ি - গোঁফ কামানাে হইতে শুরু করিয়া সন্ধ্যাহ্নিক , স্নানাহার , পােশাক - পরা , আফিস যাওয়া প্রভৃতি নিত্য কাজগুলায় বাধা পাইল না সত্য , কিন্তু ঠিক কী যে সে ভাবিতে লাগিল তাহার নির্দেশ নাই , অথচ চোখ - কান ও বুদ্ধি তাহার সাংসারিক সকল ব্যাপার হইতেই একেবারে যেন বিচ্ছিন্ন হইয়া কোন এক অদৃষ্ট অপরিজ্ঞাত রাজবিদ্রোহীর চিন্তাতেই ধ্যানস্থ হইয়া রহিল । এই অত্যন্ত অন্যমনস্কতা তলওয়ারকর লক্ষ করিয়া চিন্তিতমুখে জিজ্ঞাসা করিল , আজ বাড়ি থেকে কোন চিঠি পেয়েছেন নাকি ?

কৈ না। 

বাড়ির খবর সব ভালাে তাে ? 

অপূর্ব কিছু আশ্চর্য হইয়া কহিল , যতদুর জানি সবাই ভালােই তাে আছেন । 

রামদাস আর কোনাে প্রশ্ন করিল না । টিফিনের সময় উভয়ে একত্র বসিয়া জলযােগ করিত । রামদসের স্ত্রী অপূর্বকে একদিন সনির্বন্ধ অনুরােধ করিয়াছিলেন , যতদিন তাঁহার মা কিংবা বাসার আর কোনাে আত্মীয়া নারী এদেশে আসিয়া বাসার উপযুক্ত ব্যবস্থাদি না করেন ততদিন এই ছােটো বাহিনের হাতের তৈরি যৎসামান্য মিষ্টান্ন প্রত্যহ তাঁহাকে গ্রহণ করিতেই হইবে । অপূর্ব রাজি হইয়াছিল । আফিসের একজন ব্রাম্মণ পিয়াদা এই - সকল বহিয়া আনিত । আজও সে নিরালা পাশের ঘরটায় ভােজ্যবস্তুগুলি যখন সাজাইয়া দিয়া গেল , তখন আহারে বসিয়া অপূর্ব নিজেই কথা পাড়িল । কাল তাহার ঘরে চুরি হইয়া গেছে ; সমস্তই যাইতে পারিত , কেবল উপরের সেই ক্রিশ্চান মেয়েটির কৃপায় টাকাকড়ি ছাড়া আর সমস্ত বাঁচিয়াছে । সে চোর তাড়াইয়া দরজায় নিজের তালা বন্ধ করিয়াছে , আমি বাসায় পৌছিলে চাবি খুলিয়া দিয়া অনাহূত আমার ঘরে ঢুকিয়া ছড়ানাে জিনিসপত্র গুছাইয়া দিয়াছে , সমস্ত ফর্দ করিয়া কী আছে আর কি গেছে তার এমন নিখুঁত হিসাব করিয়া দিয়াছে যে বােধ হয় তােমার মত পাশ - করা অ্যাকাউন্টেন্টের পক্ষেও বিস্ময়কর । বাস্তবিক , এমন তৎপর , এতবড়াে কার্যকুশলা মেয়ে আর যে কেহ আছে মনে হয় না হে তলওয়ারকর ! তা ছাড়া এত বড়াে বন্ধু ।

রামদাস কহিল , তার পর ? 

অপূর্ব বলিল , তেওয়ারি ঘরে ছিল না , বর্মা নাচ দেখতে ফয়ায় গিয়েছিল , ইত্যবসরে এই ব্যাপার । তার বিশ্বাস এ কাজ ও ছাড়া আর কেউ করেনি । আমারও অনুমান কতকটা তাই । চুরি না করুক , সাহায্য করেছে । 

তার পর ? 

তারপর সকালে গেলাম পুলিশে খবর দিতে । কিন্তু পুলিশের দল এমন কাণ্ডকরলে , এমন তামাশা দেখালে যে ও - কথা আর মনেই হলাে না । এখন ভাবচি , যা গেছে তা যাক , তাদের চোর ধরে দিয়ে আর কাজ নেই , তারা বরঞ্চ  এমনিধারা বিদ্রোহী ধরে ধরেই বেড়াক । এই বলিয়া তাহার গিরীশ মহাপাত্র ও তাহার পােশাক - পরিচ্ছদের বাহার মনে পড়িয়া হঠাৎ হাসির ছটায় যেন দম আটকহিবার উপক্রম হইল । হাসি থামিলে সে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অসাধারণ পারদর্শী বিলাতের ডাক্তার উপাধিধারী রাজশত্রু মহাপাত্রের স্বাস্থ্য , তাহার শিক্ষা ও রুচি , তাহার বল - বীর্য , তাহার রামধনু রঙের জামা , সবুজ রঙের মােজা ও লােহার নালঠোকা পাম্প শু , তাহার নেবুর তেলের গন্ধবিলাস , সর্বোপরি তাহার পরহিতায় গাঁজার কলিকাটির আবিষ্কারের ইতিহাস সবিস্তারে বর্ণনা করিতে করিতে তাহার উৎকট হাসির বেগ কোনােমতে আর একবার সংবরণ করিয়া শেষে কহিল , তলওয়ারকর , মহা হুঁশিয়ার পুলিশের দলকে আজকের মতাে নির্বোধ আহম্মক হতে বােধ করি কেউ কখনাে দেখেনি । অথচ , গভর্নমেন্টের কত টাকাই না এরা বুনাে হাঁসের পিছনে ছুটোছুটি করে অপব্যয় করলে । 

রামপাস হাসিয়া কহিল , কিন্তু বুনাে হাঁস ধরাই যে এদের কাজ ; আপনার চোর ধরে দেবার জন্যে এরা নেই । আচ্ছা , এরা কি আপনাদের বাংলা দেশের পুলিশ ? 

অপূর্ব কহিল , হাঁ । তা ছাড়া আমার বড়াে লজ্জা এই যে এদের যিনি কর্তা তিনি আমার আত্মীয় , আমার পিতার বন্ধু । বাবাই একদিন এর চাকরি করে দিয়েছিলেন ।

রামদাস কহিল , তাহলে আপনাকেই হয়তো আর একদিন তার প্রায়শ্চিত্ত করাতে হবে । কিন্তু কথাটা বলিয়া ফেলিয়া সে - ই একটু অপ্রতিভ হইয়া চুপ করিল , আত্মীয়ের সম্বন্ধে এরূপ একটা মন্তব্য প্রকাশ করা হয়তাে শােভন হয় নাই । অপূর্ব তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া অর্থ বুঝিল , কিন্তু এই ধারণা যে সত্য নয় , ইহাই সতেজে ব্যক্ত করিতে সে জোর করিয়া বলিল , আমি তাকে কাকা বলি , আমাদের তিনি আত্মীয় , শুভাকাঙক্ষী , কিন্তু তাই বলে আমার দেশের চেয়ে তাে তিনি আপনার নন । বরঞ্চ , যাঁকে তিনি দেশের টাকায় , দেশের লােক দিয়ে শিকারের মতাে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন তিনি ঢের বেশি আমার আপনার । 

রামদাস মুচকিয়া একটু হাসিয়া কহিল , বাবুজি , এ - সব কথা বলার দুঃখ আছে । 

অপূর্ব কহিল , থাকে , তাই নেব । কিন্তু তাই বলে তলওয়ারকর , —শুধু কেবল আমাদের দেশে নয় , পৃথিবীর যে - কোনাে দেশে , যে - কোনাে যুগে যে - কেউ জন্মভূমিকে তার স্বাধীন করবার চেষ্টা করেছে , তাকে আপনার নয় । বলবার সাধ্য আর যার থাক আমার নেই । বলিতে বলিতে কণ্ঠস্বর তাহার তীক্ষ্ণ এবং চোখের দৃষ্টি প্রখর হইয়া উঠিল ; মনে মনে বুঝিল কী কথায় কী কথা আসিয়া পড়িতেছে , কিন্তু সামলাইতে পারিল না , বলিল , তােমার মতাে সাহস আমার নেই , আমি ভীরু , কিন্তু তাই বলে অবিচারে দণ্ডভােগ করার অপমান আমাকে কম বাজে না রামদাস । বিনা দোষে ফিরিঙ্গি ছোঁড়ারা আমাকে যখন লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বার করে দিলে , এবং এই অন্যায়ের প্রতিবাদ যখন করতে গেলাম , তখন সাহেব স্টেশনমাস্টার কেবলমাত্র আমাকে দেশি লােক বলেই দেশের স্টেশন থেকে কুকুরের মতাে দুর করে দিলে , —তার লাঞ্ছনা এই কালো চামড়ার নীচে কম জ্বলে না তলওয়ারকর ! এমন তাে নিত্য - নিয়তই ঘটছে , আমার মা , আমার ভাই - বােনকে যারা এই - সব সহস্র কোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায় তাদের আপনার বালে ডাকবার যে দুঃখই থাক আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম । 

রামদাসের সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখ ক্ষণকালের জন্য আরক্ত হইয়া উঠিল , বলিল , কৈ এ ঘটনা তাে আমাকে বলেন নি? 

অপুর্ব কহিল , বলা কি সহজ রামদাস ? হিন্দুস্থানের লােক সেখানে কম ছিল না , কিন্তু , আমার অপমান কারও গায়েই ঠেকল না এমনি তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে । লাথির চোটে আমার যে হাড় - পাঁজরা ভেঙে যায়নি । এই সুখবরে তারা সব খুশি হয়ে গেল । তােমাকে জানাব কি — মনে হলে দুঃখে লজ্জায় ঘৃণায় নিজেই যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যাই । 

রামদাস চুপ করিয়া রহিল , কিন্তু তাহার দুই চোখ ছলছল করিয়া আসিল । সুমুখের ঘড়িতে তিনটা বাজিতে সে উঠিয়া দাঁড়াইল । বােধ হয় কী একটা বলিতে গেল , কিন্তু কিছুই না বলিয়া হঠাৎ হাত বাড়াইয়া অপূর্বর ডান হাতটা টানিয়া লইয়া একটা চাপ দিয়া নিঃশব্দে নিজের ঘরে চলিয়া গেল । 

সেই দিন বিকালে আফিসের ছুটি হইবার পূর্বে বড়সাহেব একখানা লম্বা টেলিগ্রাম হাতে অপূর্বর ঘরে ঢুকিয়া কহিলেন , আমাদের ভামাের অফিসে কোনাে শৃঙ্খলাই হচ্ছে না । ম্যান্ডালে , শােএবাে , মিকথিলা এবং এদিকে প্রােম সব - কটা আফিসেই গােলযােগ ঘটছে । আমার ইচ্ছা তুমি একবার সবগুলাে দেখে আস । আমার অবর্তমানে সমস্ত ভারই তাে তােমার , -একটা পরিচয় থাকা চাই , সুতরাং বেশি দেরি না করে কাল - পরশু যদি একবার —

অপূর্ব তৎক্ষণাৎ সম্মত হইয়া বলিল , আমি কালই বার হয়ে যেতে পারি । বস্তুত , নানা কারণে রোগুনে তাহান আর একমুহূর্ত মন টিকিতে ছিল না। উপরন্তু , এই সূত্রে দেশটাও একবার দেখা হইবে । অতএব যাওয়াই স্থির হইল , এবং পরদিনই অপরাহ্ণবেলায় সুদূর ভামাে নগরের উদ্দেশে যাত্রা করিয়া সে ট্রেনে চাপিয়া বসিল । সঙ্গে রহিল আরদালি এবং আফিসের একজন হিন্দুস্থানি ব্রাহ্মণ পিয়াদা । তেওয়ারি খবরদারির জন্য বাসাতেই রহিল । পা - ভাঙা সাহেব হাসপাতালে পড়িয়া , সুতরাং তেমন আর ভয় নাই। বিশেষত , এই রেঙ্গুন শহরটি বরং সহিয়াছিল , কিন্তু আরও অজানা স্থানে পা বাড়াইবার তাহার প্রবৃণ্ডিই ছিল না । তলওয়ারকর তেওয়ারির পিঠ ঠুকিয়া দিয়া সাহস দিয়া কহিল , তোমার চিন্তা নেই ঠাকুর , কোনাে কিছু হলেই অফিসে গিয়ে আমাকে সংবাদ দিয়ে । 

গাড়ি ছাড়িতে বােধ করি তখনও মিনিট - পাঁচেক বিলম্ব ছিল , অপূর্ব হঠাৎ চকিত হইয়া বলিয়া উঠিল , ঔই যে । 

তলওয়ারকর ঘাড় ফিরাইতেই বুঝিল , এই সেই গিরীশ মহাপাত্র । সেই বাহারে জামা , সেই সবুজ রঙের ফুল মােজা , সেই পাম্প শু এবং ছড়ি , প্রভেদের মধ্যে এখন কেবল সেই বাঘ আঁকা রুমালখানি বুকপকেট ছাড়িয়া তাহার কণ্ঠে জড়ানাে । মহাপাত্র এই দিকেই আসিতেছিল , সমুছে আসিতেই অপূর্ব ডাকিয়া কহিল , কি হে গিরীশ , আমাকে চিনতে পারো ? কোথায় চলেচ ?

গিরীশ শশব্যস্তে একটা মন্ত নমস্কার করিয়া কহিল, আজ্ঞে , চিনতে পারি বৈ কি বাবুমশায় । কোথায় । আগমন হচ্ছেন ? 

অপূর্ব সহাস্যে কহিল , আপাতত ভামাে যাচ্ছি । তুমি কোথায় ? 

গিরীশ কহিল , আজ্ঞে , এনাঞ্জাং থেকে দুজন বন্ধু নােক আসার কথা ছিল , আমাকে কিন্তু বাবু ঝুটমুট হয়রান করা । হাঁ , আনে বটে কেউ কেউ আপিং সিদ্ধি লুকিয়ে , কিন্তু , আমি বাবু ভারী ধর্মভীরু মানুষ । বলি কাজ । কি বাপু জুচ্চুরিতে — কথায় বলে পরােধর্ম ভয়াবয় । লল্লাটের লেখা তাে খন্ডাবে না । 

অপূর্ব হাসিয়া কহিল , আমারও তাে তাই বিশ্বাস । কিন্তু তােমার বাপু একটা ভুল হয়েছে , আমি পুলিশের লােক নই , আফিম সিদ্ধির কোনো ধার ধারিনে , -সেদিন কেবল তামাশা দেখতেই গিয়েছিলাম । 

তলওয়ারকর তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাহাকে দেখিতেছিল , কহিল , বাবুজি , ম্যয় নে আপকো তাে জরুর কঁহা দেখা 

গিরীশ কহিল , আশ্চয্যি নেহি হ্যায় বাবু সাহেব , নােকরির বাস্তে কেত্তা যায়গায় তাে ঘুমতা হ্যায় ,

অপূর্বকে বলিল , কিন্তু আমার ওপর মিথ্যে । সন্দেহ রাখবেন না বাবুমশায় , আপনাদের নজর পড়লে চাকরি একটা জুটবে না । বামুনের ছেলে , বাংলা লেখাপড়া , শাস্তর - টাস্তর সবই কিছু কিছু শিখেছিলাম , কিন্তু এমন আদেষ্ট যে বাবুমশায় আপনারা 

অপূর্ব কহিল , আমি ব্রাহ্মণ । 

আজ্ঞে , তা হলে নমস্কার । এখন তবে আসি , -বাবুসাহেব , রাম রাম — বলিতে বলিতে গিরীশ মহাপাত্র । একটা উদগত কাশির বেগ সামলাইয়া লইয়া বাপদে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হইয়া গেল ।


অপূর্ব কহিল , এই সব্যসাচীটির পিছনেই কাকাবাবু সদলবলে এদেশ ওদেশকরে বেড়াচ্ছেন তলওয়ারকর । বলিয়া সে হাসিল । কিন্তু এই হাসিতে তলওয়ারকর যােগ দিল না । পরক্ষণে বাঁশি বাজাইয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিলে সে হাত বাড়াইয়া বন্ধুর করমর্দন করিল , কিন্তু তখনও মুখ দিয়া তাহার কথাই বাহির হইল না । নানা কারণে অপূর্ব লক্ষ করিল না , কিন্তু করিলে দেখিতে পাইত এই মুহূর্তকালের মধ্যে রামদাসের প্রশস্ত উজ্জ্বল ললাটের মনশ্চক্ষু একেবারে উধাও হইয়া গিয়াছে । উপরে যেন কোন এক অদৃশ্য মেঘের ছায়া আসিয়া পড়িয়াছে , এবং সেই সুদূর দুর্নিরীক্ষ্য লােকেই তাহার সমস্ত মনশ্চক্ষু একেবারে উধাও হইয়া গিয়াছে । 

অপূর্ব প্রথম শ্রেণির যাত্রী , তাহার কামরায় আর কেহ লােক ছিল না । সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইলে সে পিরানের মধ্যে হইতে পৈতা বাহির করিয়া বিনা জলেই সায়ংসন্ধ্যা সমাপন করিল , এবং যে - সকল ভােজ্যবস্তু শাস্ত্রমতে স্পশষ্ট হয় না জানিয়া সে সঙ্গে আনিয়াছিল , পিতলের পাত্র হইতে বাহির করিয়া আহার করিল , জল ও পান তাহার ব্রাক্ষ্মণ আরদালি পূর্বাহেই রাখিয়া গিয়াছিল , এবং শয্যাও সে প্রস্তুত করিয়া দিয়া গিয়াছিল , অতএব রাত্রির মতাে অপূর্ব ভােজনাদি শেষ করিয়া হাতমুখ ধুইয়া পরিতৃপ্ত সুস্থচিত্তে শয্যা আশ্রয় করিল । তাহার ভরসা ছিল প্রভাতকাল পর্যন্ত আর তাহার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটিবে না । কিন্তু ইহা যে কতবড়াে ভ্রম তাহা কয়েকটা স্টেশন পরেই সে অনুভব করিল । সেই রাত্রির মধ্যে বার - তিনেক তাহার ঘুম ভাঙাইয়া পুলিশের লোক তাহার নাম ও ধাম ও ঠিকানা লিখিয়া লইয়াছে । একবার সে বিরক্ত হইয়া প্রতিবাদ করায় বর্মা সব - ইনস্পেক্টর সাহেব। কটুকষ্ঠে জবাব দেয় , তুমি তাে ইউরােপিয়ান নও । 

অপূর্ব কহে , না । কিন্তু আমি তাে ফার্স্ট ক্লাস প্যাসেঞ্জার , রাত্রে তাে আমার তুমি ঘুমের বিঘ্ন করিতে পারাে না । 

সে হাসিয়া বলে , ও নিয়ম রেলওয়ে কর্মচারীর জন্য , আমি পুলিশ ; ইচ্ছা করিলে আমি তােমাকে টানিয়া নীচে নামাইতে পারি ।


 
                    

                               (সমাপ্ত)


               গল্পট কেমন লাগলো জানাবেন ।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে জানাবেন ।