কঙ্কাবতী (Kankabati) ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় নবম শ্রেণীর বাংলা গল্প।। class 9 bangali golpo

কঙ্কাবতী (Kankabati) ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় রচিত নবম শ্রেণীর বাংলা গল্প।। wh class 9 bangali golpo download pdf

 


ছবি :- পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পাঠ্যপুস্তক

           


       লেখক :-ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় 


লেখকের পরিচিত :- ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (২২ জুলাই, ১৮৪৭-৩ নভেম্বর, ১৯১৯) ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ব্যঙ্গকৌতুক রসের স্রষ্টা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। ত্রৈলোক্যনাথের কর্মজীবনের সূচনা ঘটে স্কুল শিক্ষকতার মাধ্যমে।লেখকের সম্বন্ধে আরো পড়ুন

ন-জঙ্গল, গিরি-গুহা অতিক্রম করিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় কঙ্কাবতী চলিলেন। কত পথ যাইলেন, কতদূর চলিয়া গেলেন, কিন্তু গ্রাম দেখিতে পাইলেন না। রাত্রি প্রভাত হইল, সূর্য উদয় হইলেন, দিন বাড়িতে লাগিল, তবুও জনমানবের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল না।

“কী করি, কোন দিকে যাই, কাহাকে জিজ্ঞাসা করি' কঙ্কাবতী এইরূপ চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় সম্মুখে একটি ব্যাং দেখিতে পাইলেন। ব্যাঙের অপূর্ব মূর্তি। সেই অপূর্ব মূর্তি দেখিয়া কঙ্কাবতী বিস্মিত হইলেন। ব্যাঙের মাথায় হ্যাট, গায়ে কোেট, কোমরে পেন্টুলেন, ব্যাং সাহেবের পোশাক পরিয়াছেন। ব্যাং-কে আর চেনা যায় না। রংটি কেবল ব্যাঙের মতো আছে, সাবান মাখিয়াও রংটি সাহেবের মতো হয় নাই। আর, পায়ে জুতা এখনও কেনা হয় নাই। ইহার পর তখন কিনিয়া পরিবেন। আপাতত সাহেবের সাজ সাজিয়া দুই পকেটে হাত রাখিয়া, সদর্পে ব্যাং চলিয়া যাইতেছেন।

এই অপূর্ব মূর্তি দেখিয়া, এই ঘোর দুঃখের সময়ও কঙ্কাবতীর মুখে ঈষৎ একটু হাসি দেখা দিল। কঙ্কাবতী মনে করিলেন,– ইহাকে আমি পথ জিজ্ঞাসা করি।

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ব্যাং মহাশয়! গ্রাম কোন্‌ দিকে? কোন্‌ দিক দিয়া যাইলে লোকালয়ে পৌঁছিব??

ব্যাং উত্তর করিলেন,—“হিট মিট ফ্যাট।”

কঙ্কাবতী বলিলেন, ‘ব্যাং মহাশয়! আপনি কী বলিলেন, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম না। ভালো করিয়া বলুন। আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি—কোন দিক দিয়া যাইলে গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইতে পারা যায়?' ব্যাং বলিলেন,—“হিশ ফিশ ড্যাম।”

কঙ্কাবতী বলিলেন,—'ব্যাং মহাশয়! আমি দেখিতেছি,—আপনি ইংরেজি কথা কহিতেছেন। আমি ইংরেজি পড়ি নাই, আপনি কী বলিতেছেন, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না, অনুগ্রহ করিয়া যদি বাংলা করিয়া বলেন, তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারি।

ব্যাং এদিক-ওদিক চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন যে, কেহ কোথাও নাই। কারণ, লোকে যদি শুনে যে, তিনি বাংলা কথা কহিয়াছেন, তাহা হইলে তাঁহার জাতি যাইবে, সকলে তাঁহাকে 'নেটিভ' মনে করিবে। যখন দেখিলেন, –কেহ কোথাও নাই, তখন বাংলা কথা বলিতে তাঁহার সাহস হইল। 

কঙ্কাবতীর দিকে কোপদৃষ্টিতে চাহিয়া, অতিশয় ক্রুদ্ধভাবে ব্যাং বলিলেন,—'কোথাকার ছুঁড়ি রে তুই! আ গেল যা। দেখিতেছিস, আমি সাহেব! তবু বলে, ব্যাং মশাই, ব্যাং মশাই! কেন? সাহেব বলিতে তোর কী হয়?? কঙ্কাবতী বলিলেন,— ব্যাং সাহেব! আমার অপরাধ হইয়াছে, আমাকে ক্ষমা করুন। এক্ষণে গ্রামে যাইব কোন দিক দিয়া, অনুগ্রহ করিয়া আমাকে বলিয়া দিন।

এই কথা শুনিয়া ব্যাং আরও জ্বলিয়া উঠিলেন, আরও ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বলিলেন,— 'মোলো যা। এ হতভাগা ছুঁড়ির রকম দেখ! মানা করিলেও শুনে না। কথা গ্রাহ্য হয় না। কেবল বলিবে, ব্যাং, ব্যাং, ব্যাং! কেন? আমার নাম ধরিয়া ডাকিতে কি মুখে ব্যথা হয় নাকি? আমার নাম, মিস্টার গামিশ।'

কঙ্কাবতী বলিলেন, – 'মহাশয়! আমার অপরাধ হইয়াছে। না জানিয়া অপরাধ করিয়াছি, আমাকে ক্ষমা করুন। এক্ষণে, মিস্টার গামিশ! আমি লোকালয়ে যাইব কোন দিক দিয়া, তাহা আমাকে বলিয়া দিন। আমার নাম কঙ্কাবতী। বড়ো বিপদে আমি পড়িয়াছি। প্রাণের পতিকে আমি হারাইয়াছি। পতির চিকিৎসার নিমিত্ত আমি গ্রাম অনুসন্ধান করিতেছি। রতিমাত্র বিলম্ব আর করিতে পারি না। এই হতভাগিনীর প্রতি দয়া করিয়া বলিয়া দিন—কোন দিক দিয়া আমি গ্রামে যাই।”

কঙ্কাবতী তাঁহাকে ‘সাহেব' বলিলেন, কঙ্কাবতী তাঁহাকে 'মিস্টার গামিশ বলিয়া ডাকিলেন, সে-জন্য ব্যাঙের শরীর শীতল হইল, রাগ একেবারে পড়িয়া গেল।

কঙ্কাবতীর প্রতি হৄষ্ট হইয়া ব‍্যাং জিজ্ঞাসা করিলেন,— “আমি সাহেব হইয়াছি কেন তা জান??

কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,—'আজ্ঞে না! তা আমি জানি না। মহাশয়। গ্রামে কোন দিক দিয়া যাইতে হয়?

গ্রাম এখান হইতে কতদূর?'

ব্যাং বলিলেন,——দেখো লঙ্কাবতি। তোমার নাম লঙ্কাবতী বলিলে বুঝি? দেখো লঙ্কাবতি। একদিন আমি এই বনের ভিতর বসিয়া ছিলাম। হাতি সেই পথ দিয়া আসিতেছিল। আমি মনে করিলাম আমার মানমর্যাদা রাখিয়া, অনেক ভয় করিয়া, হাতি অবশ্যই পাশ দিয়া যাইবে। একবার আস্পর্ধার কথা শুনো! দুটো হাতি পাশ দিয়া না গিয়া আমাকে ডিঙাইয়া গেল। রাগে আমার সর্বশরীর কাঁপিতে লাগিল। রাগ হইলে আমার আর জ্ঞান থাকে না। আমার ভয়ে তাই সবাই সদাই সশঙ্কিত। আমি ভাবিলাম, হাতিকে একবার উত্তমরূপে শিক্ষা দিতে হইবে। তাই আমি হাতিকে বলিলাম,—উটকপালি চিরুন দাঁতি বড়ো যে ডিঙুলি মোরে?' কেমন, বেশ ভালো বলি নাই, লঙ্কাবতি?'

কঙ্কাবতী বলিলেন,—আমার নাম কঙ্কাবতী; ‘লঙ্কাবতী' নয়। আপনি উত্তম বলিয়াছেন। গ্রামে যাইবার পথ আপনি বলিয়া দিলেন না? তবে আমি যাই, আর আমি এখানে অপেক্ষা করিতে পারি না।

ব্যাং বলিলেন,–“শুনো না। অত তাড়াতাড়ি করো কেন? দুষ্ট হাতির একবার কথা শুনো। আমি রাগিয়াছি দেখিয়া তাহার প্রাণে ভয় হইল না। হাতিটি উত্তর করিল, “থাক থাক থাক থ্যাবড়ানাকি ধর্মে রেখেছে তোরে। হাঁ কঙ্কাবতি ! আমার কি থ্যাবড়া নাক??

কঙ্কাবতী ভাবিলেন যে, এই নাক লইয়া কাঁকড়ার অভিমান হইয়াছিল, আবার দেখিতেছি, এই ভেকটিরও সেই অভিমান। কঙ্কাবতী বলিলেন,—না, না। কে বলে আপনার থ্যাবড়া নাক? আপনার চমৎকার নাক। মহাশয়। এই দিক দিয়া কি গ্রামে যাইতে হয়?

কিছুক্ষণের নিমিত্ত ব্যাং চিন্তায় মগ্ন হইলেন। কঙ্কাবতী মনে করিলেন, ভাবিয়া চিন্তিয়া ইনি আমাকে পথ

বলিয়া দিবেন। কখন পথ বলিয়া দেন, সেই প্রতীক্ষায় একাগ্রচিত্তে কঙ্কাবতী ব্যাঙের মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। স্থির-গম্ভীরভাবে অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া অবশেষে ব্যাং বলিলেন,—“তবে বোধ হয় কথার মিল করিবার নিমিত্ত হাতি আমাকে থ্যাবড়া নাকি' বলিয়াছে। কারণ, এই দেখো না? আমার কথায় আর হাতির কথায় মিল হয়

উটকপালি চিরুন-দাঁতি বড়ো যে ডিঙুলি মোরে।

থাক্‌ থাক্‌ থাক্ থ্যাবড়া নাকি ধর্মে রেখেছে তোরে?

কঙ্কাবতি! কবিতাটি খবরের কাগজে ছাপাইলে হয় না? কিন্তু ইহাতে আমার নিন্দা আছে, থ্যাবড়া নাকের কথা আছে। তাই খবরের কাগজে ছাপাইব না। শুনলে তো এখন? হাতির একবার আস্পর্ধার কথা। তাই আমি ভাবিলাম, সাহেব না হইলে লোকে মান্য করে না। সেইজন্য এই সাহেবের পোশাক পরিয়াছি। আমাকে ঠিক সাহেবের মতো দেখাইতেছে তো? এখন হইতে আমাকে সকলে সেলাম করিবে, সকলে ভয় করিবে। যখন রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণিতে গিয়া চড়িব, তখন সে গাড়িতে অন্য লোক উঠিবে না। টুপি মাথায় দিয়া আমি দ্বারের নিকট গিয়া দাঁড়াইব। সকলে উকি মারিয়া দেখিবে, আর ফিরিয়া যাইবে,—আর বলিবে,—“ও গাড়িতে সাহেব রহিয়াছে। কেমন কঙ্কাবতি? এ পরামর্শ ভালো নয়??

কঙ্কাবতী বলিলেন,—‘উত্তম পরামর্শ! এক্ষণে অনুগ্রহ করিয়া পথ বলিয়া দিন! আর যদি না দেন, তো বলুন আমি চলিয়া যাই।"

কানে হাত দিয়া ব্যাং জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কী বলিলে?'

কঙ্কাবতী বলিলেন, – 'আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কোন পথ দিয়া গ্রামে যাইব? গ্রাম এখান হইতে কতদূর।

কতক্ষণে সেখানে গিয়া পৌঁছিব?'

ব্যাং বলিলেন,—আমার একটা হিসাব করিয়া দাও। পথ দেখাইয়া দিব কী, আমি এখন ঘোর বিপদে পড়িয়াছি। আমার একটি আধুলি ছিল; একজনকে তাহা আমি ধার দিয়াছি। তাহার সহিত নিয়ম হইয়াছে যে, যাহা বাকি থাকিবে, প্রতিদিন তাহার অর্ধেক দিয়া সে ঋণ পরিশোধ করিবে। প্রথম দিন সে আমাকে চারি আনা দিবে, দ্বিতীয় দিন দুই আনা দিবে, তৃতীয় দিন এক আনা, চতুর্থ দিন দুই পয়সা, পঞ্চম দিন সে এক পয়সা দিবে। এক পয়সায় হয় পাঁচ গন্ডা, অর্থাৎ কুড়ি কড়া। ষষ্ঠ দিনে সে আমাকে দশ কড়া দিবে। তার পরদিন সে আমাকে পাঁচ কড়া দিবে। তার পরদিন আড়াই কড়া, তার পরদিন স-কড়া, তার পরদিন তার অর্ধেক, পরদিন তার অর্ধেক, পরদিন তার অর্ধেক

অতি চমৎকার সুমিষ্ট কান্না-সুরে ব্যাং এইবার গলা ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন, “ওগো! মা গো। এ যে আর কখনও শোধ হবে না গো। আমার আধুলিটি যে, আর কখনও পুরাপুরি হবে না গো। ওগো আমি কোথায় যাব গো! জুয়াচোরের হাতে পড়িয়া আমার যে সর্বস্ব গেল গো। ওগো আমার যে ওই আধুলিটি বই পৃথিবীতে আর কিছু নাই গো! ওগো তা লইয়া মানুষে যে ঠাট্টা করে গো! 'ব্যাঙের আধুলি', 'ব্যাঙের আধুলি' বলিয়া মানুষে যে হিংসায় ফাটিয়া মরে গো! ওগো মা গো! আমার কী হলো গো!?

ব্যাং পুনরায় আধ-কান্না সুরে ফুঁপিয়া-ফুঁপিয়া বলিলেন,—“ওগো! আমি যে মনে করিয়াছিলাম,—দুই দণ্ড বসিয়া তোমার সঙ্গে গল্পগাছা করিব গো! ওগো তা যে আর হইল না গো। ওগো আমার যে শোকসিন্ধু উথলিয়া উঠিল গো! ওগো তুমি ওই দিক দিয়া যাও গো! তাহা হইলে লোকালয়ে পৌঁছুতে পারিবে গো। ওগো সে যে অনেক দূর গো। ওগো আজ সেখানে যাইতে পারিবে না গো! ওগো তোমরা যে আমাদের মতো লাফাইতে পার না গো! ওগো তোমরা যে গুটি গুটি চলিয়া যাও গো! ওগো তোমাদের চলন দেখিয়া, আমার যে কান্না পায় না গো। ওগো তুমি যে লোক ভালো গো।... আমার যে আধুলিটি এইবার জন্মের মতো গেল গো! ওগো! আমার কী হইল গো! ওগো মা গো।'



                                               সমাপ্ত

                পিডিএফ ডাউনলোড করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে জানাবেন ।