![]() |
ছবি :- পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পাঠ্যপুস্তক |
লেখক :- পান্নালাল প্যাটেল
হােলির দিনের পড়ন্ত বিকেল । নিম গাছের নীচে গায়ের একদল ছেলে জড়াে হয়ে ধুলাে ছােড়াছুড়ি করে খেলছিল । হাত ধরাধরি করে অমৃত ও ইসাব ওদের কাছে এল । দুজনের গায়েই সেদিনকার তৈরি নতুন জামা । রং , মাপ , কাপড় – সব দিক থেকেই একরকম । এরা দুজনে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে । রাস্তার মােড়ে এদের বাড়ি দুটোও মুখােমুখি । দুজনের বাবাই পেশায় চাষি , জমিও প্রায় সমান সমান । দুজনকেই সাময়িক বিপদ আপদে সুদে ধার নিতে হয় । বলতে গেলে ছেলেদুটোর সবই একরকম , তফাত শুধু এই যে , অমৃতের বাবা - মা আর তিন ভাই রয়েছে , ইসাবের আছে শুধু তার বাবা । দুই বন্ধুতে মিলে শান বাঁধানাে ফুটপাথে এসে বসতে , ওদের একরকম পােশাক দেখে দলের একটি ছেলে বলল , “ ঠিক , তােরা দুজনে কুস্তি কর তাে , দেখি তােরা শত্তিতেও সমান - সমান , না একজন বড়াে পালােয়ান ।
আরেকটি ছােলে চেচিয়ে উঠল , ' লড়ে যা তোরা , বেশ মজা হবে । ”
ইসাব অমৃতের দিকে তাকাল । ' অমৃত দৃঢ়স্বরে বলল , “ না , তাহলে মা আমাকে ঠ্যাঙ্গাবে ।
অমৃতের অত জোর দিয়ে বলার কারণ ছিল । বাড়ি থেকে রােবার সময় ওর মা সাবধান করে দিয়েছিলেন , নতুন জামা পাবার জন্য তুমি কী কাণ্ডটাই না করেছিলে ; এখন যদি তুমি জামা ময়লা করে বা ছিড়ে আসো , তাহলে তোমার কপালে কী আছে মনে রেখাে ।
অমৃত সত্যি তার বাবা - মাকে খুব জ্বালিয়েছিল। শােনা মাত্র অমৃত ফতােয়া জারি করে নিল , ঠিক ইসাবের মতো জামাটি না পেলে ও স্কুলে যাবে না ।
মা ওকে অনেক বুঝিয়েছিল , “ ইসাবকে ক্ষেতে কাজ করতে হয় বলে ওর জামা ছিড়ে গেছে , আর তােরটা তাে প্রায় নতুনই রয়েছে ।
‘ মােটেই না , বলে কঁদতে কাঁদতে অমৃত ওর জামার একটা ছেড়া জায়গায় আঙুল ঢুকিয়ে আরাে ছিড়ে দেয় ।
মা তখন ওকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বললেন , ' নতুন জামা দেবার আগে ইসাবের বাবা ওকে খুব মেরেছিলেন , তুইও সেরকম মার খেতে রাজি আছিস ? '
অমৃত এতেও পিছপা হাতে রাজি নয় । ও মরিয়া হয়ে বলল , “ ঠিক আছে , আমাকে বেঁধে রাখাে ! মারাে । কিন্তু তােমাকে ইসাবের মতাে একটা জামা আমার জন্য জোগাড় করতেই হবে ।
অমৃতের মা এসব ঝামেলা থেকে বাঁচবার জন্য বললেন , “ ঠিক আছে , তাের বাবাকে গিয়ে বলগে ।
অমৃত জানত মা ‘ না ’ বললে ওর বাবার রাজি হবার সম্ভাবনা খুবই কম । কিন্তু অত সহজে হাল ছাড়ার পাত্রও সে নয় । ও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল , খাওয়া ছেড়ে দিল এবং রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে রাজি হলাে না । শেষমেশ ওর মা হাল ছেড়ে দিয়ে অমৃতের বাবাকে ওর জন্য নতুন জামা কিনে দিতে রাজি করালেন । এর পর উনি গিয়ে ইসাবের বাবার গােয়ালঘর থেকে লুকিয়ে থাকা অমৃতকে বাড়ি নিয়ে এলেন ।
সুন্দর সাজগােজ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমৃতের একেবারেই ইচ্ছে ছিল না জামাকাপড় নােংরা হয় এমন কিছু করতে । বিশেষ করে ইসাবের সঙ্গে কুস্তি লড়তে তাে একেবারেই গররাজি ।
এমন সময় ছেলেছােকরার দল থেকে একজন এসে হাত দিয়ে অমৃতের গলা জড়িয়ে ধরে বলল , ‘ এসাে , আমরা কুস্তি লড়ি । ”
এই বলে সে অমৃতকে খােলা মাঠে নিয়ে এল । অমৃত ওর বাঁধন কেটে বেরুবার চেষ্টা করতে করতে বলল , “ দেখ কালিয়া , আমি কুস্তি লড়তে চাই না , আমাকে ছেড়ে দে । ' কালিয়া তাে ওকে ছাড়লই না , বরং ছুঁড়ে মাটিতে ফেলে দিল । ছেলের দল আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল , ' কালিয়া জিতেছে , অমৃত হেরে গেছে , কী মজা , কী মজা।
ইসাবের মেজাজ চড়ে গেল । ও কালিয়ার হাত ধরে বলল , “ আয় , আমি তাের সঙ্গে লড়ব । ' কালিয়া ইতস্তত করছিল , কুস্তি শুরু হয়ে গেল । ইসাব ল্যাং মারতে কালিয়া ব্যাঙের মতাে হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে চাচাতে লাগল ।
তামাশা করে হলেও এখন ব্যাপারটা ঘােরালাে হয়ে পড়েছে এবং কালিয়ার বাবা - মা এসে ওদের পিটুতে পারে বুঝতে পেরে সবাই যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল ।
অমৃত আর ইসাবও রণভূমি ত্যাগ করল । কিছুটা যেতেই অমৃতের নজরে এল যে ইসাবের জামার পকেট ও ছ'ইঞ্চি পরিমাণ কাপড় ছিড়ে গেছে । ওরা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল । ওরা জামা কতটা ছিড়েছে পরীক্ষা করছে , এমন সময় শুনতে পেল ইসাবের বাবা ইসাবাকে ডাকছেন ।
ওদের তখন বুকের ধুকপুকুনি বন্ধ হবার জোগাড় , ওরা জানে ইসাবের বাবা ছেড়া শার্ট দেখা মাত্র ওর চামড়া তুলে নেবে । উনি সুদখােরের কাছ থেকে টাকা ধার করে অনেক বাছাবাছি করে কাপড় কিনে জামা সেলাই করিয়েছিলেন ।
ইসাবের বাবা আবার চেঁচিয়ে উঠলেন , “ কে কাঁদছে , ইসাব কোথায় ?
হঠাৎ অমৃতের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল , ও ইসাবকে টানতে টানতে বলল , ' আমার সঙ্গে আয় । ” ওদের দুই বাড়ির মাঝখানে ঢুকে অমৃত জামার বােতাম খুলতে লাগল । ও হুকুম দিল , “ তাের জামা খুলে আমারটা পর।
ইসাব বলল , ' তাের কী হবে , তুই কী পরবি ? ”
অমৃত বলল , ‘ শিগগির কর , নয়তাে কেউ দেখে ফেলবে । আমি তােরটা পরব । ”
‘ ইসাব জামা খুলতে লাগল , যদিও অমৃত কী করতে চাইছে বুঝতে পারছিল না , বলল , “ জামা অদল - বদল ? কিন্তু তাতে সুবিধাটা কী হবে , তােকে তাে তাের বাবা পিটোবে । ”
অমৃত বলল , “ নিশ্চয় ঠ্যাঙ্গাবে , কিন্তু আমাকে বাঁচানাের জন্য তাে আমার মা আছে ।
ইসাবের মনে পড়ল , ও দেখেছে যে , অমৃতের বাবা যখনই মারতে গেছেন , অমৃত ওর মায়ের পেছনে লুকিয়েছে । মার হাতে অবশ্য ওকে দু'চার থাপ্পড় খেতে হয়েছে , কিন্তু বাবার ভারী হাতের মারের কাছে ও কিছুই নয়।
ইসাব তবু ইতস্তত করছে , এমন সময় সে খুব কাছে কাউকে কাশতে শুনল , তক্ষুণি ওরা ঝটপট জামা অদল - বদল করে , গলি থেকে বেরিয়ে ধীরে সুস্থে নিঃশব্দে যে যার বাড়ির দিকে চলল ।
ভয়ে অমৃতের বুক ঢিপঢিপ করছিল । কিন্তু ওর কপাল ভালাে দিনটা ছিল হােলির , সে সময় সবাই জানে কিছুটা ধস্তাধস্তি টানা হচড়া চলে । মা যখন দেখলেন জামাটা ছিড়েছে , উনি ভুরু কুঁচকোলেন কিন্তু মাফ করে দিলেন । একটা সুঁচসুতাে নিয়ে ছেড়া জামাটা রিফু করে দিলেন।
এতে দুজনেরই ভয় কেটে গেল , ওরা আবার হাত ধরাধরি করে গ্রামের ধারে হােলির সময়কার বাজি আর বুড়ির বাড়ি পােড়ানাে দেখতে গেল ।
একটা ছেলে ওদের জামা বদলানাে দেখেছিল , সে ওদের আনন্দ মাটি করার জন্য বলল , “ তােরা অদল - বদল করেছিস , হুম ! '
সে তাদের জামা অদল - বদল করা দেখে ফেলেছে এই আশঙ্কা করে তারা চলে যেতে চাইল। কিন্তু ইতিমধ্যে অন্য ছেলেরাও কি ঘটেছে জেনে চাচাতে লাগল , ' অদল - বদল , অদল - বদল । অমৃত আর ইসাব সরে পড়তে চাইল , কিন্তু ছেলের দল তাদের পেছনে পেছনে ' অদল - বদল , অদল - বদল ! ” বলে চাচাতে লাগল । বাবারা তাদের ব্যাপারটা জেনে ফেলবে মনে করে তারা ভয়ে বাড়ির দিকে ছুটে পালাতে লাগল ।
ইসাবের বাবা বাড়ির সামনের দাওয়ায় খাটিয়ায় বসে ইকো খাচ্ছিলেন , তিনি ওদের ডাকলেন , “ তােমরা বন্ধুদের কাছ থেকে পালিয়ে আসছ কেন? আমার কাছে এসে বসাে।
ওঁর শান্ত গলা শুনে ওদের চিন্তা হলাে , ভাবল , যা ভেবেছিলাম তাই হলাে , উনি আসল ঘটনাটা জানেন , শুধু ভালােবাসার ভান করছেন ।
ইসাবের বাবা পাঠান , উনি দশ বছরের অমৃতকে জড়িয়ে ধরলেন । চেঁচিয়ে বললেন , বাহালি বৌদি , আজ থেকে আপনার ছেলে আমার । বাহালি বৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসতে হাসতে বললেন , ' হাসান ভাই , আপনি এক ছেলেকেই দেখে উঠতে পারেন না , তা দুজনকে কী করে সামলাবেন ? ”
আবেগ ভরা গলায় হাসান বললেন , ‘ বাহালি বৌদি , অমৃতের মতাে ছেলে পেলে আমি একুশজনকেও পালন করতে রাজি আছি । ”
কেশে গলা পরিষ্কার করে পাঠান বাহালি বৌদিকে বললেন , ' ছেলে দুটোকে গলিতে ঢুকতে দেখেই ভেবে নিলাম , দেখতে হবে ওরা কী করে । পাড়া - পড়শি মায়ের দল পাঠানের গল্প শােনার জন্য ঘিরে দাড়াল ।
উনি অল্প কথায় ছেলেদের জামা বদলের গল্পটা বললেন , আরাে বললেন , ‘ ইসাব অমৃতকে জিজ্ঞেস করেছিল , তাের বাবা যদি তােকে মারে কী হবে ? অমৃত কী জবাব দিয়েছিল জানেন ? বলেছিল কিন্তু আমার তাে মা রয়েছে।'
সজল চোখে পাঠান বললেন , ' কী খাঁটি কথা ! অমৃতের জবাব আমাকে বদলে দিয়েছে । ও আমাকে শিখিয়েছে , খাঁটি জিনিস কাকে বলে ।
অমৃত ও ইসাবের পরস্পরের প্রতি ভালােবাসার গল্প শুনে তাদেরও বুক ভরে গেল ।
ইতিমধ্যে ছেলের দল বাজি আর বুড়ির বাড়ি পােড়ানাে দেখে ফিরছিল । তারা ইসাব অমৃতকে ঘিরে বলতে লাগল , ‘ অমৃত - ইসাব- অদল - বদল , ভাই অদল - বদল ।
এবার অবশ্য ইসাব ও অমৃত অপ্রস্তুত বােধ করল না , বরঞ্চ অদল - বদল বলাতে তাদের ভালােই লাগল ।
অদল - বদলের গল্প গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গ্রাম - প্রধানের কানে গেল । উনি ঘােষণা করলেন , “ আজ থেকে আমরা অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকব ।
ছেলেরা খুব খুশি হলাে , ক্রমশ গ্রাম পেরিয়ে আকাশ বাতাসও ‘ অমৃত - ইসাব অদল - বদল , অদল - বদল এই আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল।
