সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
“ আজ্ঞে সার , নাম মইলােবাস , নিবাস সাকিন মাদারহাটি , পােস্টাআপিস গােকরােণ , থানা কান্দি , জেলা মুচ্ছিদাবাদ ... '
— ‘ ভালাে । কী চাই '
—'আজ্ঞে , সাহায্যে !'
—' সাহায্য ? কেন ? কীসের ?'
—'আজ্ঞে সার , বেউলোর দলের । '
ব্লসেরকারী সমাজ শিক্ষা সংগঠক ভুরু কুঁচকে তাকান । — 'সে আবার কী ? ’ সঙ্গে এসেছে মতি চৌকিদার । সবিনয়ে হেসে বুঝিয়ে দেয় , 'বেউলানখিন্দর পালা সার । পেচণ্ড বান - বন্যেয় সাজের বাকসােপেটরা সব ভেসে গিয়েছে । দেখুন না , দরখাস্তে অলপ্রধান সব নিকে দিয়েছেন । মইলােবাস , দরখাস্তটা আগে দাও সারাকে ।অফিসার বাবুটি কলকাতার মানুষ । সবে চাকরি পেয়ে এই অখদ্যে জায়গায় এসেছেন । খিকখিক করে । হাসেন ।— 'তাই বলাে । তা কী নাম বললে
যেন ! '
— ইলােবাস স্যাক , সার ।
অফিসার তাকান লােকটির দিকে । বছর বিয়াল্লিশের মধ্যেই বয়স সম্ভবত । বিশাল শরীর । গায়ে ময়লা হাতাগুটানাে রঙিন পানজাবি , পরনে মালকোচা ধরনে ধুতি — এলাকার মাটির হলদে ছােপলাগা , পায়ে রবারের ফাটাফুটো স্যান্ডেল এবং কাঁধে তেমনি শ্রীহীন ঝােলা । লােকটার গায়ের রং তামাটে । খাড়া মস্তো নাক , বড়াে বড়াে কান , টানা চোখে হতচকিত বিহবলতা , কপালে তিনটে ভাজ । তুমি তাে শিল্পী তাহলে । আর্টিস্ট ! হ্যা ? ” বড়াে কান , টানা চোখে হতচকিত বিহবলতা , কপালে তিনটে ভাজ । একমাথা বাবরি চুল । তিনি ফের হাসেন —
'তুমি তো শিল্পী তাহলে । আর্টিস্ট ! হ্যা ?
মতি হাসে। মইলােবাসও সাহস পেয়ে হাসে । মতির সলাতেই এসেছে । মতি বলে— ' হুকুম পেলে এক আসর গেয়ে দেবে , সার । কিন্তু পেচণ্ড বানে ...
মইলেবাস যুগিয়ে দেয়— ‘ সাজ ভেসে গিয়েছে।অফিসার আরামে হেলান দিয়ে বলেন- ‘ তাে মইলাবাসটা কী , বলাে তাে ?
পিছনে থেকে তৃতীয় একজন , সে একেবারে তরুণ কালাে বেঁটে ও কুচ্ছিত চেহারা , পরনে ধুতি ও নীলচে হাফশার্ট , ব্যাখ্যা করে দেয়— নাম সার মওলা বখশ । অশিক্ষিত লােক সব । কেউ ডাকে মৌলবাস , কেউ মইলােবাস । '
– তুমি কে ?
– আমি সার বাহাসতুল্লা । দলে বৈয়ালি করি ।
– অ্যাঁ ?
এসব আঞ্চলিক টার্ম ভদ্রলােকের জানবার কথা নয় । মতি সব ব্যাখ্যা করে । বৈয়ালি বা বইয়ালি করা মানে প্রম্পট করা । বাহাসতুল্লা অল্পস্বল্প লেখা - পড়া জানে । সে পালার হাতেলেখা মস্তো খাতা প্রম্পট করে । আসরে । তখন তাকে মাথায় হারিকেন চাপিয়ে আলাে দেয় যে তার নাম নগেন বাগদি । আঙুলে সিঙ্গি মাছের কাঁটা ফুটে জ্বর হয়েছে বলে আসতে পারেনি । বানের জল নেমে গিয়ে খালে জলায় এখন বেশ মাছ হচ্ছে ।
দরবার করতে আরও সব এসেছে । যে বেউলাে সাজে , তার গায়ের রং কালাে । হালকা গড়ন । মুখে মেয়েলি ছাঁদ । বছর পনেরাে ষােলাে বয়স হবে । নাম অমুল্য , জাতে বাউরী । আর লখিন্দর ? সে না এসে পারে ? দল - দল করেই তার বউ পালিয়েছে । তালাক দিতে হয়েছে । কারণ শশুর লােকটা , ফরাজি সম্প্রদায়ের । তাদের কাছে গানবাজনা হারাম নিষিদ্ধ । বিয়ের আগে জামাই দলের নিহক ‘ সাপােট্টার ’ হিল । হঠাৎ আগের লখিন্দর খুনের মামলায় জেলে ঢুকল । ঢুকলো তাে ঢুকলই । ফিরতে বুড়াে হয়ে যাবে । তখন খোঁজো নতুন নখাইকে । লখিন্দর বা নখাই হবে সুপুরুষ – ঢলঢল রূপলাবণ্য , আসরে তাকে দেখাবে দ্বারকানদীর আদিম বিশুদ্ধ আকাশের সেই প্রকৃত চাঁদ ( মাদারহাটির ধরণী তহশিলদার আজও বিশ্বাস করেন , সেই চাঁদে আমেরিকান বা রাশিয়ানদের বাবার সাধ্যি নেই পা বাড়ায় এবং সােনাই ফকির হুঁ হুঁ হেসে বলেছিল — এ চাঁদ কি সে চাঁদ বটে মানিকরা ? " ) সেই চির অলৌকিক চাঁদ ঢুকবে আসরে , চাঁদসদাগরের চোখের মণি ! আর চারু মাস্টারের বেহালা শুনে ছৈরন্দির বিধবা মেয়েটা তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদবে । আসরে তখন বিপুল জ্যোৎস্নায় হাজার বছরের গ্রামীণ বিষাদ জেগে উঠবে । সে কী সহজ কথা ? খোঁজো সেই আদরের নখাইকে । নখাই মিলেছিল । আকাশ আলি নাম । বাপের নাম আব্বাস হাজি । হজ করেছে দাঁত পড়েছে । মােড়ায় বসে শণের দড়ি পাকায় । ছেলে নথাই সাজে তাে কী করবে ? যৈবনে মানুষ বুনাে ঘােড়া । বয়স হলে তখন তৌবা করে মক্কা যাবে । ব্যাস !
আকাশ আলি হিরাে । তাই তার চুলে তেল বেশি । গায়ে আন্দির পানজাবি কিন্তু কুঁচকে জড়ােসড়াে । হাতে ঘড়িও আছে । হজে গিয়ে বাপ এনেছিল । পায়ে কাদায় ভূত কাবুলি চপ্পল ।
কিন্তু সে বড়াে লাজুক । পিছনেই আছে । দরজার কাছে । আর আছে ' নারাণবাবু'তবলচি । বাবু মনে বাবুবাড়ির গাঁজাখাের উড়ুক্কু মাস্তান ছেলে । বাড়ি পাশের গায়ে । ভদ্রলােকের গাঁ । বাবা ননী মুখুয্যে পােস্টমাস্টার ছিলেন । হেলে নারাণ ক্লাস ফোরেই বেরিয়ে পড়েছে , স্বাধীনতার স্রোতে ভাসমান । মদতাড়িগাঁজাভাং জমিয়ে টেনেছে এই বয়সেই । কিন্তু সেও শিল্পী ছেলে । তবলায় ঠুংরিগাইয়ে ওস্তাদ হাবল গোঁসাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল । গোঁসাই বলেছিলেন— ' আয় শালা , সঙ্গ ধর । ” কিন্তু সমফাকের মুখে গোঁসাইয়ের থাপ্পড় মারা অভ্যেস । একে তাে সব সময় মাথার মধ্যে ভো বাজে । অগত্যা নারাণ জুটেছে বেউলাে দলে । ব্লক আপিসে দলের সঙ্গে রিপ্রেজেন্টশনে । এসেছে । কারণ সঙ্গে একজন বাবুটাবু থাকা ভালােই , যদি পাত্তা দেন ওনারা ।
অফিসার বলেন — ' তাহলে তুমিই চাদ সদাগর ?
মইলােবাস সলজ্জ মাথা নাড়ে । মতি বলে—
শুধু তাই না সার , ও ছিল একসময় এলাকার সেরা পালােয়ান । মালামােতে ওর জুড়ি ছিল না । সাতখানা মেডেল আছে ঘরে । লতুন গামছা যে কত পেয়েছিল , হিসেব নেই । মৌরীগাঁর বাবুরা পেতলের ঘড়া দিয়েছিলেন । ওনাদের গায়ে হায়ার করে এনেছিল পচ্ছিমে পালােয়ান । ভকতরাম নাম তাকেও ধুলোপিঠ করেছিল আমাদের মইলেবাস । কিন্তু শরীলে ব্যামাে ঢুল । এখন ভেতরটা ঝাঝরা .. অফিসার কেমন করে জানবেন এসব ? খরার দুতিনটে মাস বৃষ্টির আশায় গাঁয়ে - গাঁয়ে মালামাে হয় দিনক্ষণ দেখে । একজোড়া ঢােল বাজে । ঢোলের বােল ভারি মজার ;
চো ঢিপাকাঠি ঢিপ ঢিপাং
ওই শালাকে চিৎপটাং ....
জড়াজড়ি দুই জোয়ান মাটিতে দাপাদাপি তুলেছে , গগন - পবন দুভাই ঢুলি তাদের ঘিরে দ্রুততালে বাজাতে থাকে ... চিৎপটাং ... চিৎপটাং চিৎপটাং ... এবং একজন চিৎপটাং হলেই ঢেলে তেহাইয়ের শ্বাসছাড়া আওয়াজটি ওঠে — ডুডুম ! গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে হাজার গ্রামীণ মানুষ : এই ও - ও - ও । গাঁয়ের বউঝি চমকে উঠেই হাসে হাসিটি হাজার বছরের ।
একদা মহলােবাস ছিল পালােয়ান । পালােয়ান ছাড়া চাঁদ সদাগর মানাবে কেন ? সওয়া হাত বুকের ছাতি না হলে কেমন করে বেরােবে ও ভয়ঙ্কর গর্জন : ' সাবধানে চ্যাংমুড়ি কানি ! ”
মাথায় লাল ঝলমলে পাগড়ি , গায়ে লাল রেশমি বেনিয়ান রাংতার কাজ করা , পরনে মালকোচাকরা লাল কাপড় আর হাতে হিত্তালের লাঠি । উঁচু হয়ে থাকা মুখ , পাকানাে বিশাল গোঁপ , কপালে লাল ফেঁটা — সাজঘর থেকে হুংকার দিতে দিতে আসরে আসে- ‘ জয় শম্ভো ! জয় শম্ভো !
-বলাে হে চাঁদ সদাগর , একবার পার্টি বলাে শুনি! মতি শশব্যস্তে বলে নজ্জা করছে সার । সরকারি আপিস বটে কি না । আসরে হলে ..
- উঁহু , একবার তাে শুনি । নৈলে কেমন করে বুঝবাে যে সত্যি আছে তােমাদের বেহুলার দল ? ” সমস্যা বটে । মতি বলে— “ তিন - পুরুষের দল , সার । নিবাস আলি গােমস্ত পালাটা নেকেছিলেন আমার কত্তাবাবার আমলে । সেই খাতা এখনও আছে । তা থেকে নকলে নিয়ে চলছে । বিশ্বাস না হলে এনকোয়ারি করে আসুন।
মবৈয়াল বাহাসভুরা বলে— “ আমার দাদা এখনও বেঁচে আছে , সার । তার মুখেই শুনবেন । ছেলেবেলায় তিনি বেউলাে সাজতেন । তেমন বেইলাে আর হবে না সার । মৌরীতলার বাবুদের কেষ্টযাত্রার দল ছিল । ওনারা দুবছর আটকে রেখে রাধিকে করেছিলেন । শেষে গাঁসুদ্ধ লােক আসর থেকে তুলে নিয়ে আসে । খুব হ্যাঙ্গামা হয়েছিল সার । শশির মতাে গলা , আর চেহারাও সার তেমনি । এখন দেখলে মিথ্যে লাগবে।
বিরক্তি অফিসার বলেন– “ ঠিক আছে । দেখব’খন । কিন্তু হবে কিনা বলতে পারছি না । এখন এসব ব্যাপার। আপাতত বন্ধ।
মইলােবাস অভিমানে মুখ খােলে আবার । - লক্ষ্মীনারাণপুরের মনিরুন্দি কেষ্টযাত্রার সাজ কিনতে টাকা পেয়েছে । বাবুদের যাত্রার দল তাে সব গাঁয়ে টাকা পাচ্ছে । মনিবুদ্দি আমার ভাইরাভাই সার । সে বললে তােমরাও পাবে । তাই এলাম । আসতাম না — বানে যে সাজের বাকাসাে ভেসে গেল । মাদারহাটিতে এক বুক পানি হয়েছিল এনকুরি করুন । করে দেখুন !
অফিসার তাকিয়ে থাকেন । ভাবেন । তারপর একটু হেসে বলেন– “ চৌকিদার , তুমি কীসের পার্ট কারাে বললে না তাে ?
মতি চৌকিদার — সে সরকারি লােক , পরানে রাজপােশাক , তার দাপটে মাদারহাটি থরথর করে কাপে । তারও কালাে মুখে লজ্জার রং ঝলকে ওঠে । মাথা নীচু করে বলে— ‘ আমি সার সঙাল । সঙ দিই । কমিক পার্টও করি । লেজ লাগিয়ে হনুমান সাজি । চাঁদ সদাগরের লৌকো ডুবিয়ে দিই। আবার ফটিকচাঁদ কুম্ভকারও সাজি । কখনও বিবেকও হই । গান গাই । '
- “ বাঃ ! তাহলে তুমিই একটা গান শােনাও ।
— “ আজ্ঞে ? ”
সকৌতুকে অফিসার বলেন- ' না শােনালে দরখাস্ত পড়ে থাকবে , চৌকিদার ।
অগত্যা একটু কেসে এবং এদিক - ওদিক তাকিয়ে মতি সলজ্জ হেসে বলে— বরঞ্চ ফটিকচাঁদের গানটাই গাই , সার ।
- 'বেশ , গও ।'
মতি আচমকা লাফ দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে গেয়ে ওঠে : ‘ ও কে ডাকলে রে ফটিকচাঁদ পিসে ।আষাঢ় মাসে চাক ঘােরে না রইয়েছি বসে । ওকে ডাকলে রে - এ - এ এ । ....
আপিসসুদ্ধ তােলপাড় অমনি । এ - ঘর - ও - ঘর কেরানিবাবুরা বেরিয়ে আসেন । বিড়িও সায়েব বাইরে । কৃষি অফিসার উকি মারেন । প্রৌঢ় হেডক্লার্ক বিরক্ত হয়ে গজগজ করেন । কিন্তু ফাইলের একঘেয়েমি হঠাৎ এক আজগুবি ঘটনার তলায় চাপা পড়ে তাে মন্দ না । ভিড় জমেছে বারান্দা অব্দি । আরে বাবা , এতাে শহরের কেতাদুরস্ত আপিস নয় । মাঠের মধ্যে একতালা কিছু দালান । পিছনে খাল । দিনমান চাষাভূষা লােকের আনাগােনা । আবহাওয়াটাই এ রকম । মিছিল , দাবিদাওয়া , রিলিফ , সেচ , সার , কতরকম ফরিস্তি । তার সঙ্গে কালচার । হ্যা , ফোক কালচার । জাতীয় সড়কের ধারে এই বাজাডাঙায় এক সময় ফণিমনসা কেয়া ঝােপ আর বাজপড়া তালগাছ ছিল । সেখানে এখন এই সব বাড়ি আর ফুলবাগিচা । ইউক্যালিপ্টাসের চিরােল পাতা কাপে হাওয়ায় । খালের সাঁকোতে জিপের চাকা ঘটঘটাং আওয়াজ তুলে কংক্রিটে গিয়ে উধাও হয় । মাথার ওপর বিদ্যুতের তার । দূর মাঠের দিগন্তে বিশাল মঞ্চের সারি । ফলকে লেখা আছে ‘ এগারাে হাজার ভােল্ট , সাবধান । তার নীচে মড়ার মুণ্ডু আর দুটো আড়াআড়ি হাড় । তার আশেপাশে নির্ভীক চাষা লাঙল ঠেলে উররর হট হেট হেট ...
ততক্ষণে চাদ সদাগরও তৈরি । মতির সাহসে সাহস । সামনে এক পা বাড়িয়ে দৈত্যের মতাে লােকটা বিকট গর্জে বলে উঠেছে ; ‘ থাবর্দার চ্যাংমুড়ি কানি ! প্রাণ যদি চলে যায় , পুবের সূর্য যদি ওঠে পশ্চিমে , শিব ছাড়া ভজব না — পস্টো কথা কহে দিলাম । দুর হয়ে যাও । দূর দূর দূর , এবং তারপর যেন পােজপশ্চার দেখিয়ে বুকের পাশে । হাত চেলে চুপ করে গেছে ।
হাে হাে করে হাসেন বাবুরা । কেউ - কেউ বলেন— বরং বেহুলার গান শােনাও হে ! বেহুলা কই ? আসেনি ?
বাউরির ছেলে অমূল্য একটু কেসে এক কানের পেছনে হাত রেখে গেয়ে ওঠে :
একো মাসা দুয়াে রে মাসাে
তিনাে মাসাে যায় রে সােনার কমলা ।।
জলে ভেইস্যে যায় রে সােনার কমলা ।
ও কী , জলে ভেইসো যায় রে সােনার কমলা ।
সত্যি বড়াে মিঠে গলা । সুরে আদিম আবেগ আছে একটা । দুয়েকজন বাবুর ফোক সঙের বাতিক আছে । তারা অভিভূত হন । একজন বলেন — ' আমাগাে পূর্ববঙ্গে মুসলমানেরাও এগুলা গাইত । আর গাজির গানও ছিল । তহন আমরা সব পােলাপান ! এক্কেরে এইটুকুখানি ।
সমাজশিক্ষা সংগঠক বলেন— “ রিয়েলি , আমার ধারণাও ছিল না এসব । মুসলমানেরাও বেহুলা - কেষ্টযাত্রা করে ? মাই গুডনে শরৎ চাটুয্যের ওই এক গহর ছিল । ভাবতুম , নিছক গুল ! অথচ ... ভাবা যায় না !
মারহাটির বেহুলা দলটি মুখ তাকাতাকি করে । ছ'মাইল জলকাদার মাঠ ভেঙে এসেছে । সময়টা হেমন্ত ।। রােদ এখনও কড়া । দরদর করে ঘাম ঝরায় । সবুজ মাঠ এবার পলির রঙে হলুদ । পচা ধানপাতার কটু গন্ধ ছড়াচ্ছে । গাঁয়ে ফিরে এক দফা কটু - কাটব্য শুনতে হবে বুড়ােদের । আর কিছু বলার কথা ছিল না ? সাজ কেনার সাহায্য চাইতে গেলে এই দুঃসময়ে ? ঘরে - ঘরে মুখ চুন , খড়িপড়া চেহারা , রিলিফের পথ চেয়ে উসখুস করছে প্রতীক্ষায় । আর এই দুঃসময়ে কিনা বেউলাে দলের সাজ ভেসে গেছে , সাহায্য চাই ? লক্ষ্মী - নারাণপুরের মনিবুন্দি মাস্টার কেষ্টযাত্রার সাজ সাহায্য পেয়েছে , ভালাে কথা । সেখানে তাে বানবন্যা হয়নি । ডাঙা দেশ । শুখা - খরা নেই । ক্যানেলের জলে চাষ হয় । তাই বলে ডুবাে দেশ মাদারহাটির তাে এ সখ মানায় না
তবে সে জন্যে এদের মুখ তাকাতাকি নয় । সার যে গহরের নাম করলেন , তাই শুনে । তার সঙ্গে চাটুয্যেও বললেন । এতেই সব প্রাঞ্জল হয়েছে । নতুন গাঁর গহর আলি পাক্কা ছড়াদার অর্থাৎ কবিয়াল । তার গুরু চাটুয্যে বটে , তবে শরৎচন্দ্র নন – পূর্ণচন্দ্র । পূর্ণবাবু এখন বুড়ােমানুষ । তার ওপর সেবার গাজনে নিজের বেহাইয়ের । নামে ( কেলেঙ্কারির ) সঙের গান বেঁধে জামাই চটান এবং মেয়ের দুর্ভোগ বাধিয়ে বসেন । শেষে অব্দি মেয়ের মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছেন , এই শেষ । ওদিকে গহরের রবরবা বেড়ে যায় । সেই গহরেরও এবার বরাত মন্দ । নতুন গাঁ ডুবেছে । গহর বুক চাপড়ে কেঁদেছে । সদ্য কিনে আনা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণখানাও সর্বনাশা দ্বারকা ভাসিয়ে নিল । রামায়ণ - মহাভারত গেল যাক । ওস্তাদ চাটুয্যে বলেছেন — আমাদের — আমার - গুলাে নিয়ে যেও । পদ্মপুরাণ , মার্কণ্ডেয় পুরাণ , কালিকাপুরাণ , প্রভাসখণ্ড চেয়ে - চিন্তে কদিনে ধারে যােগাড় করেছে রমজান দোকানির কাছে । দোকানির কারবার নুন তেলের । যৌবনে সখ ছিল ছড়াদার হবে । হতে পারেনি । কিন্তু শাস্ত্ৰ - পুরাণতত্ত্বে মহা ধুরন্ধর সে । বড়াে বড়াে কবির আসরে প্রখ্যাত কবিয়ালদেরও আসর থেকে উঠে আচমকা এমন প্রশ্ন করে , ঘােল খাইয়ে ছাড়ে । এদিকে সন্ধ্যার নমাজের আজান শুনলে মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যায় । তার তিন ছেলেও ও সব তত্ত্বে বিশারদ । বােলানের দল করেছে । তারা আসরে প্রতিপক্ষকে কাবু করতে চায় । পাল্টা কাবু হালে বাপের কাছে দৌড়ে আসে ... হ গাে ,
কুশঘাসের জন্ম কীসে বলে দাও তাে শিগগির ? রমজান হেসে বলে বরাহ অবতারের তিন গাছা লোম তুলে রেখেছিলেন মহামুনি বাল্মীকি । তাই থেকে কুশ । তবে পাল্লাদারকে শুধােস । তাে বাবা , আদিতে যখন নিরাকার , তখন ভগবান ভাসালেন বটপত্রে । বটগাছ নিরাকার ব্রয়াণ্ডে তাহলে এল । কোত্থেকে ? এমনি সব পৌরাণিক রহস্যের জগতে বাস তাদের । একখানা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ বন্যায় ভেসে গেলে একটা রহস্যময় ভূভাগ হারিয়ে গেল সামনে থেকে । সবে সৃষ্টি বর্ণনাটা পড়া হয়েছিল গহারের । এই দুঃসময়ে দশটা টাকা পাবে কোথায়।
