![]() |
ছবি :- পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পাঠ্যপুস্তক |
লেখক :- সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
লেখকের পরিচিত :- সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় একজন জনপ্রিয় বাঙালি লেখক যিনি মূলত রম্য রচনার জন্য খ্যাত। তিনি বেশ কিছু উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তার সবথেকে বিখ্যাত উপন্যাস লোটাকম্বল যা দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখকের সম্বন্ধে আরো পড়ুন
১২০০ বঙ্গাব্দ , ১১ আশ্বিন , বুধবার সকালে , হালিশহরে মাহিষ্যবংশে রাসমণির জন্ম । দরিদ্রের কন্যা । পিতা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন হারু ঘরামি নামে । হারু ঘরামির মেয়ে রাসমণি । মায়ের নাম রামপ্রিয়া । মা টুকটুকে ফর্সা এই মেয়েটির নাম রাখলেন রানি । পরে হবে রাসমণি । আর গ্রামবাসীরা দুটি নাম একত্রিত করে বলতে লাগলেন , রানি রাসমণি । একদিন যে সত্যই তিনি রানি হবেন । কঁসির রানি লক্ষ্মীবাই , বাংলার রানি রাসমণি ।। দু’জনেই যুদ্ধ করবেন ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে ।
পিতা হরেকৃয় , লােকমুখে হারু । সামান্য লেখাপড়া জানতেন । মেয়েকেও শিখিয়েছিলেন । যে পল্লিতে তিনি বাস করতেন একমাত্র তারই বাড়িতে রাতে রামায়ণ , মহাভারত , পুরাণাদি পাঠ করা হতাে । গ্রামবাসীরা লণ্ঠন হাতে শুনতে আসতেন । সে এক অপূর্ব দৃশ্য ! বালিকা রাসমণি অবাক হয়ে দেখতেন - অন্ধকার পথে আলাের সারি মাঠ পেরিয়ে , যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে । আলাে হাতে এসেছিল । তীর্থে , এখন ফিরে যাচ্ছে সবাই দল বেঁধে । সব মানুষের ভেতরেই যেন দুটো মানুষ থাকে । মামলা , মােকদ্দমা , দলাদলি , মারামারি , অভাব , অসুখ সবই আছে কিন্তু রাতের আলােয় অতীতের পথ চিনে নেওয়ার আগ্রহ কিছু কম নেই । মহাভারতের - ভাগবতের শ্রীকৃয় , রামায়ণের রাম , লক্ষ্মণ , সীতা— সবাই আছেন , চিরকাল থাকবেন । রাসমণির বালিকা হৃদয়ে একটা সুখ - সুখ ভাব আসে । ভীষণ একটা ভালােলাগা ।
বৈয়ব পরিবার । গলায় তুলসীর মালা , নাকে তিলক । এই তিলক আঁকায় সকলেরই কিছু সময় যায় । তা যাক । এ যে ধর্ম ! রাসমণিও অতি নিষ্ঠার সঙ্গে নাকে , কপালে , বাহুতে তিলক আঁকতেন । সুন্দরীকে আরাে সুন্দর দেখাতাে । রাসমণির মা রামপ্রিয়া বেশিদিন বাঁচেননি । রাসমণি সাতবছরে পা দিয়ে দেখলেন মা নেই । তিনি মা - হারা । মাত্র আটদিনের জ্বরে পরলােকে চলে গেলেন রামপ্রিয়া ।
রাসমণির বয়স হলাে এগারাে বছর । চোখে পড়ার মতাে সুন্দরী । সেই সময় কলকাতায় অনেক বড়ােলােক । বড়াে বড়াে লােক । একদিকে জোড়াসাঁকো , অন্যদিকে জানবাজার , মাঝখানে মানিকতলা । জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রিন্স দ্বারকানাথ , মানিকতলায় রাজা রামমােহন , সংস্কৃত কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , সিমুলিয়ার দত্তবংশ – যেখানে আসবেন স্বামী বিবেকানন্দ । বিদেশিরাও এসে গেছেন - ডেভিড হেয়ার ঘড়ির ব্যবসা বন্ধ করে শিক্ষার প্রসারে আত্মনিয়ােগ করেছেন । আলেকজান্ডার ডাফ সাহেব খ্রিস্টধর্মের প্রচারে উদ্যোগী । জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ বড়াে হচ্ছেন । ব্রাহ্মসমাজের দরজা এইবার খুলবে । বাঙালির জাগরণের কাল ধর্মে - সাহিত্যে - সংস্কৃতিতে । বাঙালি ব্যবসাতেও নেমেছে । লক্ষ্মীলাভের সুযােগ এসেছে । সমুদ্র ডাকছে । স্বদেশ , বিদেশে বিপুল বাণিজ্য ।
কলকাতার জানবাজার । অনেক অনেক বছর আগে জন সাহেব এখানে একটি বাজার করেছিলেন । লােকমুখে জনবাজার হয়ে গেল ‘ জানবাজার । এখন যেখানে ফ্রিস্কুল স্ট্রিট , নিউ মার্কেট – তারই পাশে । এই জানবাজারের এক ধনী বাঙালির নাম প্রীতিরাম দাস । ছিলেন গরিব , হয়েছেন ধনকুবের । কেউ করে দিতে পারে না , নিজেকে । হতে হয় । এই হলাে জগতের নিয়ম । উদ্যোগী পুরুষের লক্ষ্মী , সরস্বতী দুটিই লাভ হয় । পলাশিযুদ্ধের চারবছর আগে ১৭৫৩ সালে এক দরিদ্র পরিবারে প্রীতিরামের জন্ম । গুরুমশায়ের পাঠশালায় সামান্য বাংলাভাষা ও গণিত শিখেছিলেন , এমন সময় পিতা এবং মা দুজনেই মারা গেলেন । তখন প্রীতিরামের বয়স চোদ্দো বছর । এইবার কী হবে ! একা তাে নয় । পরপর দুটি ভাই - রামতনু ও কালীপ্রসাদ । চোদ্দো বছরের দাদা মহা চিন্তায় পড়লেন । ভাগ্যদেবীর পরীক্ষা ।
জানবাজারে সেই সময় বাস করছেন বিখ্যাত জমিদার মান্নাবাবু । সেই পরিবারের গৃহিনী প্রীতিরামের এক পিসি । প্রীতিরাম তার দুই ভাইকে নিয়ে এই মান্নাপরিবারে আশ্রয় নিলেন । উদ্যোগী প্রীতিরাম জীবনের কাছে হার স্বীকার করার জন্যে জন্মাননি । ইতিহাসের উপাদান । ইংরেজের কলকাতা । চতুর্দিকে টাকা উড়ছে । ধরতে পারলেই ধনী । প্রীতিরাম অল্প , কাজ - চলা গােছের ইংরিজি শিখে দালালি ও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে রসদ মােগাবার কাজে নেমে পড়লেন । ইংরেজ সৈন্যদের মাল সরবরাহ । ফোর্টের এক পদস্থ ইংরেজ কর্মচারীর সুনজরে পড়লেন প্রীতিরাম । ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল । তিনি ওই সাহেবের সঙ্গে ঢাকায় গেলেন । সাহেবের সুপারিশে নাটোর রাজদরবারে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হলেন । প্রচুর টাকা রােজগার করে ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে আবার কলকাতায় ফিরে এলেন , তখন তার বয়স চব্বিশ । যুবক প্রীতিরাম । যথেষ্ট বিত্তশালী । আশ্রয়দাতা মান্নাপরিবারের যুগল মান্নার এগারাে বছরের মেয়ের সঙ্গে তার বিবাহ হলাে । যৌতুক হিসাবে পেলেন জানবাজারের কয়েকখানা বাড়ি ও যােলাে বিঘা জমি । পর পর দুটি পুত্রলাভ করলেন । ১৭৭৯ সালে প্রথম পুত্র হরচন্দ্র , ১৭৮৩ - তে দ্বিতীয় পুত্র রাজচন্দ্র ।
প্রীতিরামের ভাগ্য তর তর করে এগােচ্ছে । কলকাতাও ক্রমশ জমজমাট হচ্ছে । প্রতিরাম আমদানি , রপ্তানির । ব্যবসা শুরু করলেন । ১৭৮৭ সালে বার্ন কোম্পানির মুৎসুদ্দি হলেন । মুৎসুদ্দি আরবি শব্দ , বাংলা অর্থ প্রধান , প্রতিনিধি । নাটোররাজের অধিকারস্থ কয়েকটি পরগনা খাজনা বাকি পড়ায় নিলামে উঠল । ১৮০০ সালে । প্রতিরাম দেওয়ান শিবরাম সান্যালের সহায়তায় উনিশ হাজার টাকায় মকিমপুর পরগনাটি কিনে নিলেন । ছােটোভাই কালীপ্রসাদকে এই পরগনার নায়েব নিযুক্ত করলেন । তিনি সেখান থেকে জানবাজারের বাড়িতে বাঁশ , কাঠ , মাছ চালান দিতে লাগলেন । প্রতিরাম ওইসব পণ্য বিক্রির জন্যে বেলেঘাটায় একটি আড়ত খুললেন । সেকালে অনেক বাঁশ একসম্পে বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে আনা হতাে । একে চলিত কথায় বলা হতাে , বাঁশের মাড় । বংশব্যবসায়ী প্রীতিরাম ব্যবসাগত উপাধি লাভ করলেন , ‘ মাড় । এই সময়েই বেলেঘাটায় তিনি একটি লবণের আড়তও স্থাপন করলেন । ধনলাভের সব পথই খুলে গেল । অনাথ প্রীতিরাম কলকাতার এক নম্বর বড়ােলােক ।
প্রীতিরাম তার দুই পুত্রকে সেই যুগানুসারী লেখাপড়া শেখালেন । কলকাতা সেইসময়ে শিক্ষার আলােকে জাগছে । ছেলেদের বিবাহ দিলেন । বাড়ো ছেলে হরচন্দ্র এত সুখ , এত প্রাচুর্য বেশিদিন ভােগ করতে পারলেন না। নিঃসন্তান স্ত্রীকে রেখে চিরবিদায় নিলেন অকালে ।
১৮০২ সালে কনিষ্ঠপুত্র রাজচন্দ্রের বিবাহ দিলেন । বছর না পেরােতেই স্ত্রী - বিয়ােগ । পরের বছরে আবার বিবাহ । এবারেও সেই একই ব্যাপার । বিয়ের বছরেই স্ত্রীর মৃত্যু । আশ্চর্যের ব্যাপার । হ্যা , আশ্চর্যই । এইবার রাজচন্দ্রের স্ত্রী হয়ে আসবেন অলৌকিক এক রমণী , শক্তিরূপা । জানবাজার , জানবাজারের এই পরিবার এবং এই বঙ্গদেশকে তার অবদানে সমৃদ্ধ করবেন । ইতিহাসে সংযুক্ত করবেন উজ্জ্বল এক অধ্যায় । বাংলার নবজাগরণের পুরােহিত ।
প্রীতিরাম রাজচন্দ্রের আবার বিবাহ দেবেন । পাত্রীর খোঁজ চলেছে । রাজচন্দ্ৰ শিক্ষিত , সংযত , ধর্মপ্রাণ । মাঝে মাঝেই নৌকা করে ত্রিবেণীতে গঙ্গাস্নান করতে যান । এইরকম এক নৌকাভ্রমণের সময় দুর থেকে কোনার ঘাটে সুন্দরী একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন । জানবাজারে ফিরে এসে তার ভালােলাগার কথা পরিজনদের জানালেন । ঘটকদের অনুসন্ধান শুরু হলাে । খবর এল , কন্যাটির পিতা হরেকৃষ্ন দাস । প্রীতিরাম । তার । পুত্রের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন । হরেকৃষ্ন যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন । এমনও হয় নাকি !
কলকাতার সেরা ধনীর ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের কন্যার বিবাহের প্রস্তাব । এ কোনাে অলৌকিক ঘটনা ! পৃথিবীর ঘটনা । তবু বলতে হয় , ছেলেবেলায় , যখন বয়েস আরাে কম , রাসমণি ডুমুরের ফুল দেখেছিলেন , যা সাধারণত দেখা যায় না । তাঁর মা বলেছিলেন , “ সে কি রে ? রানি । তুই তা হলে সত্য সত্যই রানি হবি ! ' তার দেখা
হলাে না ।
১৮০৪ সালে রাজচন্দ্রের সঙ্গে রাসমণির বিবাহ হলাে । সমারােহ , ধুমধাম । এ কি শুধু বিবাহ ? প্রথমে তাই । শেষে ইতিহাস । তখন আর প্রীতিরাম , রাজচন্দ্র , জানবাজার নয় । উনবিংশ শতাব্দী ও রানি রাসমণি । প্রতিরামের জীবদ্দশায় রাজচন্দ্র ও রাসমণির দুটি কন্যা হলাে – পদ্মমণি ও কুমারী । ১৮১৩ সালে প্রীতিরাম জানবাজারের বর্তমান সুবৃহৎ পারিবারিক আবাস নির্মাণের কাজ শুরু করান । ১৮১৭ সালে চৌষটি বছর বয়সে প্রীতিরাম দাস পরলােকগমন করেন । সেই সময় স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার সম্পত্তির পরিমাণ সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা ।
প্রীতিরামের সুযােগ্য পুত্র রাজচন্দ্র । আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত । আধুনিক মনােভাবাপন্ন । কুসংস্কারমুক্ত উদার প্রকৃতির যুবক । পিতার ব্যবসা ও সম্পত্তির হাল ধরলেন । ইংলন্ডে কলভিন কাউই কোম্পানিকে এজেন্ট নিযুক্ত করে , তিনি এদেশ থেকে তসরের চাদর , মৃগনাভি , আফিং , নীল প্রভৃতি বিলেতে রপ্তানি করতে লাগলেন । প্ৰথর ব্যবসায়বুদ্ধি , সেইরকম উদ্যোগী । অবশ্যই ভাগ্যবান । একটি উদাহরণ , নিলামে পঁচিশ হাজার টাকার আফিং কিনে সেইদিনেই পচাত্তর হাজার টাকায় বিক্রি করে দিলেন । একদিনে পঞ্চাশ হাজার টাকা লাভ । ক্রমশ , ক্রমশ ধন , জন , বিত্তবৈভব বাড়ছে । সকলেরই প্রত্যয় , ঘারে এসেছেন লক্ষ্মী । নাম তার রাসমণি। রাজচান্দ্রর সুযােগ্য সহধর্মিণী ।
পিতার পরলােকগমনের বহারেই রাসমণি পেলেন তার তৃতীয়কন্যা করুণাময়ীকে । পরের বছরই বড়াে মেয়ের বিবাহ দিলেন । জানবাজারের এই মহৎ পরিবার ক্রমশই এক অদৃশ্য ঐতিহাসিক ভবিষ্যতের দিকে চলেছে । সেখানে অর্থের সঙ্গে ধর্মের মহামিলন ঘটাবেন রানি রাসমণি । ১৮১৯ সালে রাসমণি একটি পুত্রসন্তান পেলেন , কিন্তু মৃত । চারবছর পরে এল কনিষ্ঠ কন্যা জগদম্বা । পরবর্তীকালে এঁর ভূমিকাও ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।১৮৩১ সালে তৃতীয়কন্যা করুণাময়ী পরলােকগমন করলেন । রেখে গেলেন স্বামী মথুরামােহন বিশ্বাস ও একমাত্র পুত্র ভূপালচন্দ্রকে । এই মথুরামােহনও একদিন ইতিহাস হবেন । সেইদিন আসন্ন । ভবিষ্যতের সাজঘরে চরিত্ররা প্রস্তুত হচ্ছেন । সেই কারণেই মথুরামােহন জানবাজার থেকে মুক্তি পেলেন না । ১৮৩৩ সালে রাজচন্দ্র কনিষ্ঠ কন্যা জগদম্বার সঙ্গে মথুরামােহনের বিবাহ দিলেন । এই মানুষটি নব্য বাংলার আলােকপ্রাপ্ত এক চরিত্র । শ্রীরামকৃষ্ণু পরমহংসদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। রাজচন্দ্রের অনেক অবদান । প্রচুর উপার্জন , বিষয় সম্পত্তি , প্রচুর দান ধ্যান , সৎকার্যে অর্থব্যয় । তিনি দশ - বারােজন ছাত্রের সমস্ত খরচ চালাতেন । তাঁর দাম্পত্যজীবনে এসেছিল স্বর্গের সুখ , শান্তি ও পূর্ণতা ।
স্ত্রীর অনুরােধে কলকাতার গঙ্গায় নির্মাণ করিয়ে দিলেন সুন্দর এক স্নানঘাট , যা আজ বাবুঘাট ’ নামে বিখ্যাত । দু'বছরের মধ্যে তৈরি করে দিলেন ঘটে যাওয়ার সুন্দর একটি রাস্তা । পর পর হতে লাগল আরাে জনহিতকর কাজ , বেলেঘাটার খাল খনন , নিমতলার পুরােনাে ঘাট ও মুমূখুঁনিবাস নির্মাণ , আহিরীটোলার ঘাট তৈরি , মেটকাফ হলে অর্থ সাহায্য , হিন্দু কলেজে ও দুর্ভিক্ষভাণ্ডারে দান ইত্যাদি জনহিতকর কাজের জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৩ সালে রাজচন্দ্রকে ‘ রায় ’ উপাধি দিলেন । কিন্তু আর মাত্র তিনবছর । এই ব্রতধারী , কর্মময় , বদান্য সমাজসেবী মানুষটি পৃথিবীকে বিদায় জানাবেন ১৮৩৬ সালে মাত্র তিপান্ন বছর বয়সে । আর কি আশ্চর্য , ওই বছরই কামারপুকুরে এলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায় , পরমহংসে শ্রীরামকৃষ্ণু ।
এইবার প্রকাশিত হলাে রাসমণির ব্যক্তিত্ব । শুধু জানবাজারে নয় , সমগ্র বঙ্গে শুরু হলাে ‘ রাসমণি যুগ । সেইকালে স্বামীর পারলৌকিক শ্রাদ্ধে খরচ করলেন ৫৫ হাজার টাকা । তারপর বিপুল সম্পত্তির দায়িত্বভার তুলে নিলেন নিজের হাতে । অনেকেরই সন্দেহ , তিনি কি পারবেন । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিপুল জমিদারির রক্ষণাবেক্ষণ । একদিকে দুষ্ট জমিদারদের অভাব নেই , তাদের লেঠেল , খুনির দল , চোর - ডাকাত , দস্য , ইংরেজ শাসকগােষ্ঠী , অত্যাচারী ইংরেজ নীলকরেরা , সমাজের অজর সমস্যা , কৃষকদের শােচনীয় দারিদ্র্য , দুর্ভিক্ষ , মহামারি , বন্যা । বিপন্ন বাংলা , বিপন্ন বাঙালি । নারীদের অবস্থা আরাে শােচনীয় । পুরুষশাসিত সমাজে ' তারা অর্ধমৃত। বাল্যবিবাহ , বিধবাবিবাহ , সতীদাহ । রাসমণির বিচক্ষণতা , ক্ষাত্ৰতেজ , দূর্দান্ত সাহস , কূটনৈতিক বুদ্ধি অচিরেই কলসে উঠবে । রাজচন্দ্র তার বিশিষ্ট বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথকে তার বিশেষ প্রয়ােজনে দু'লক্ষ টাকা ধার হিসেবে দিয়েছিলেন । দ্বারকানাথ সেই ধার শােধ করতে পারেননি । দ্বারকানাথ রানিমা'র কাছে এসেছেন । নানা কথার পর বললেন , তােমার এখন । একজন ম্যানেজারের প্রয়ােজন ।
পর্দার আড়ালে বসে রানিমা মধুরমােহনের মাধ্যমে দ্বারকানাথের সঙ্গে কথা আদান - প্রদান করছেন । রানিমা বললেন , ' রাখলে ভালাে হয় ঠিকই কিন্তু তেমন বিশ্বাসী মানুষ পাব কোথায় ? '
দ্বারকানাথ বললেন , “ তেমন হলে আমি তাে আছি । '
ভয়ডরশূন্য রানিমা এইবার স্পষ্ট বললেন , “ সে তাে খুব ভালাে কথা , তবে আমি এখনাে জানতে পারিনি যে , আমার স্বামীর কার কার কাছে কত টাকা পাওনা আছে । তবে আমার স্বামী আপনাকে যে দু - লক্ষ টাকা ঋণ দিয়েছিলেন , সেই টাকাটা যদি আপনি আমাকে এখন ফেরত দিতেন , তবে আমার বিশেষ উপকার হতাে ।
সম্ভ্রান্ত দ্বারকানাথ স্তম্ভিত । তিনি যা ভেবেছিলেন এই পর্দানশীন মহিলা তাে তা নয় । এর যে দেখি অসীম শক্তি । স্পষ্টবক্তা , দুর্দান্ত সাহসী । যেন বজ্র ! দ্বারকানাথ খুবই বিব্রত বােধ করলেন । নগদ দু - লক্ষ টাকা তার পক্ষে তখনই দেওয়া সম্ভব ছিল না । রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত তার স্বরুপপুর পরগনাটি তিনি রাসমণির নামে লিখে দিলেন । সেইসময় এই পরগনার বার্ষিক আয় ছিল ৩৬ হাজার টাকা ।
দ্বারকানাথ সেইসময় তাঁর নানা ব্যবসাপ্রচেষ্টায় মার খাচ্ছেন একের পর এক । বড়াে বড়াে সব ব্যাপার । তিনি আবার রানিমার কাছে ম্যানেজার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন । রাসমণি জামাতা মথুরামােহনের মাধ্যমে । জানালেন , আমি এক সামান্য বিধবা , আমার এই সামান্য বিষয়সম্পত্তি , আপনার মতাে যােগ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধান করতে বলাটা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা । আমার পুত্রস্থানীয় ভাবী উত্তরাধিকারী জামাতারাই এ কাজ পারবে । দ্বারকানাথ পরে স্বীকার করেছিলেন , ' উত্তম বুঝলাম , এই রানি সামান্যা স্ত্রীলােক নন ।
সেকালের জমিদারদের খুব সুনাম ছিল না । নানা কায়দায় সম্পত্তি বাড়াতেন । নৃশংস পদ্ধতিতে খাজনা উসুল করতেন । রানিমা’র জমিদারির মধ্যে একটি তালুকের নাম ছিল জগন্নাথপুর । তালুকটির চারদিকেই নড়াইলের জমিদারের জমিদারি । সেইসময় নড়াইলের জমিদার , রামরতন রায় । তার প্রবল ইচ্ছা , রাসমণির এই তালুকটি তিনি গ্রাস করবেন । তার সুপরিকল্পিত অত্যাচারে জগন্নাথপুরের প্রজারা অতিষ্ঠ । লুটপাট , গৃহদাহ , নরহত্যা । আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাসমণির ওই তালুকের প্রজাদের নিজের বশে আনার চেষ্টা । রানির প্রচণ্ড প্রতাপের কাছে তাকে হার স্বীকার করতে হলাে । প্রজাদের ওপর অত্যাচার রানি সহ্য করতে পারবেন কী করে ? তিনি যে তাদের মা । তার আদেশে ‘ মহাবীর ’ নামে এক সর্দারের নেতৃত্বে একদল লাঠিয়াল এল জগন্নাথপুরে প্রজাদের রক্ষার জন্যে । মহাবীর মথুরবাবুর অত্যন্ত প্রিয় লাঠিয়াল । গণ্ডীর প্রকৃতির , শক্তিশালী , সদাশয় । মহাবীরের আগমনে রামতরনের লেঠেলরা প্রথমে একটু পিছিয়ে গেলেও , পেছন থেকে অতর্কিত ছুরি চালিয়ে মহাবীরকে হত্যা করল।
রামরতন অনুমান করতে পারেননি জানবাজারের রানির শক্তি ও দৃঢ়তা কতটা । মহাবীরের হত্যার প্রতিশােধ নিতে হবে । চব্বিশ পরগনা , বর্ধমান , হুগলি ও অন্যান্য জায়গা থেকে রানিমা বেছে বেছে লাঠিয়াল , পাইক , সড়কিওয়ালা প্রভৃতি সংগ্রহ করলেন । নেতৃত্বে জগন্নাথপুরের নায়েব । ওদিকে জমিদার রামরতন রায়ও দাঙ্গার জন্যে প্রস্তুত । রানিমার বাহিনীর কৃষ্কাকায় ভীষণাকার বলশালী যােদ্ধরা টাঙ্গি , বল্লম , বর্শা , লাঠি , সড়কি , কুঠার ইত্যাদি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে , ‘ জয় মায়ের জয় ’ , ‘ জয় রানি রাসমণির জয় ' ধ্বনিতে আকাশ - বাতাস কঁপিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যে প্রস্তুত । ওদিকে রানির নামে এই ভীষণ হুঙ্কারে বিপক্ষ স্তম্ভিত । রানিমায়ের নামমাহাত্মেই দাঙ্গা আর হলাে না । বহু লােকের প্রাণ বাঁচল ।
এখনাে হয়নি । রামরতনের এখনাে কিছু পাওয়া বাকি আছে । রানিমা প্রতাপশালী এই জমিদারটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রুজু করলেন । হার হালাে রামরতনের । প্রজারা সুরক্ষিত হলেন । তার জমিদারির মকিমপুর । পরগনায় নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার শুরু হলাে । অভাবনীয় অত্যাচারে পল্লিজীবন ছারখার । চাষের জমিতে ধানের পরিবর্তে গায়ের জোরে নীল বুনতে বাধ্য করা । ইংরেজের আদালতে ইংরেজদের সাতখুন মাপ । মকিমপুরে সবচেয়ে অত্যাচারী নীলকরের নাম ডােনাল্ড । একে টিট কার দাওয়াই লাঠি । আদালত কিছু করবে না । রানিমার লাঠিয়ালরা এসে ডােনাল্ডকে পিটিয়ে আধমরা করে দিলে । সাহেবরা আদালতে গেলেন । সুবিধে করতে পারলেন না । মামলা খারিজ হয়ে গেল । রানিমা তার এলাকা থেকে সব নীলকরদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন । কর্মচারীদের আদেশ দিলেন । কোনাে চাষিই যেন কোনাে কারণে কোনাে সাহেবের কাছে জমি বিক্রি না করে ।
পরে যা বিদ্রোহের আকার নেবে , ' বঙ্গে নীল বিদ্রোহ ' , তার সূচনা করেছিলেন বাংলার রানি রাসমণি ।। ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে তার লাগাতার ‘ আইনি সংগ্রাম । প্রজাস্বার্থবিরােধী কিছু করলেই প্রজারা দেখতেন , রানি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে রক্ষাকী । গঙ্গায় জেলেরা মাছ ধরতে চাইলে ' জলকর দিতে হবে । প্রথমে দরিদ্র মৎস্যজীবীরা প্রতিকারের জন্য শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাহায্য চাইলেন । এঁদের মধ্যে ছিলেন রাজা । রাধাকান্তদেব বাহাদুর । কিন্তু প্রবলপ্রতাপ ইংরেজ সরকারকে ঘটাবার সাহস কারাে হলাে না । তখন তাঁরা ভাবলেন , এই বিপদে আমাদের একজনই আছেন – রানিমা ।
এবার আর লাঠি নয় , বুদ্ধি । রানিমা সরকারের কাছ থেকে জেলেরা গঙ্গার যে অংশে মাছ ধরে অর্থাৎ হাওড়ার ঘুসুড়ি থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত , দশ হাজার টাকায় ইজারা নিলেন । ইংরেজ সরকার টাকা ছাড়া আর কিছু বােঝে না । রানি রাসমণি টাকা দিয়েছেন । গঙ্গালিজ মঞ্জুর । এইবার আসল খেলা । রানিমা তার কর্মচারীদের আদেশ দিলেন , লিজে নেওয়া গঙ্গার অংশটা এপাশে ওপাশে লােহার মােটা চেন দিয়ে ঘিরে দাও । ওই অংশটুকু আমার । গঙ্গাবন্ধনে সরকারের টনক নড়ল । জাহাজ , নৌকা চলাচল বন্ধ । রানিমা'র কৃপায় জেলেরা মানের আনন্দে মাছ ধরছেন ।
সরকারের দপ্তর থেকে নােটিস এল , জলপথ কেন বন্ধ করা হয়েছে ? কারণ দর্শাও । মাল চলাচলের অসুবিধে করে বাণিজ্যিক ক্ষতিসাধন করা অপরাধ বলে গণ্য হবে না কেন ? রানিমার ভয়ডর নেই । লড়াই করছেন সসাগরা ইংরেজ সরকারের সঙ্গে । বুদ্ধির প্যাচ । নােটিস পেয়েও গঙ্গার চেন খুললেন না । সরকারকে জানালেন , ' আমি নির্ধারিত কর দিয়ে করছেন সসাগরা ইংরেজ সরকারের সঙ্গে । বুদ্ধির প্যাচ । নােটিস পেয়েও গঙ্গার চেন খুললেন না । সরকারকে জানালেন , ' আমি নির্ধারিত কর দিয়ে গঙ্গা জমা নিয়েছি , অতএব আইনত আমি ঐ পথ বন্ধ করতে পারি । আমার প্রজাদের অসুবিধা হচ্ছে । এই অংশে অনবরত জাহাজ চলাচল করলে , এবং কলকাতার বন্দরে জাহাজের ঘাঁটি হলে , এখানে গায় জাহাজের শব্দের ভয়ে মাছ থাকবে না । প্রজাদের এই ক্ষতি এড়াবার জন্যই আমি এখানে জাহাজ আসতে দিতে পারি না । এই অকাট্য যুক্তির কোনো উত্তর সরকারের মাথা থেকে বেরলো না। তখন আপস। রানিমা বললেন,
‘গঙ্গা জমা নেওয়ার ইচ্ছা আমার আদৌ নেই। আমি শুধু গরিব জেলেদের মুখ চেয়েই এটি জমা নিয়ে কোনো
কর ছাড়াই তাদের মাছ ধরতে দিতাম। সরকার যদি আগেকার মতো কর ছাড়াই আবার জেলেদের মাছ ধরতে
দেন, তাহলে আমি পথ খুলে দিতে রাজি আছি।
প্যাচে পড়ে সরকার ‘জল করা তুলে দিতে বাধ্য হলেন। রানিমার লিজের পুরো টাকা ফিরিয়ে দিলেন। গঙ্গা বন্ধন মুক্ত হলো। জেলেরা পেলেন করমুক্ত মাছ ধরার অধিকার, আজও যা বহাল আছে। সারা বাংলায় রানিমার নামে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। সকলের মুখে মুখে একটি গান
“ধন্য রানি রাসমণি রমণীর মণি।
বাংলায় ভালো যশ রাখিলে আপনি।।
দীনের দুঃখ দেখে কাঁদিলে আপনি ।
দিয়ে ঘরের টাকা পরের জন্যে বাঁচালে প্রাণী।
যে যশ রাখিলে তুমি হইয়ে রমণী।
ঘরে ঘরে তোমার নাম গাইল দিবস রজনি।'
জানবাজারের বিশাল সাতমহলা বাড়িতে খুব ঘটার দুর্গাপূজা। জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি রাজচন্দ্রই করিয়েছিলেন। জানবাজারের সম্পত্তি। সপ্তমীর সকালে ঢাকঢোল সহাযোগে পুরোহিতরা ওই পথ দিয়ে নবপত্রিকা স্নান করাতে নিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তার পাশের একটি বাড়িতে এক সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি চিৎকার করছেন, 'স্টপ ইট, স্টপ ইট।' রানিমা এই প্রতিবাদে আদৌ বিচলিত না হয়ে নির্দেশ দিলেন, আমাদের ধর্ম, আমাদের বিধান। ধর্মে সাহেবি হস্তক্ষেপ। যা হচ্ছে তাই হাবে, আরো বেশি হবে। তিনদিন ওই রাস্তায় ভোরবেলা প্রবল সোরগোল। আরো জোরে জোরে বাদ্যবাজনা। অপমানিত সাহেব রাসমণির বিরুদ্ধে মামলা করলেন। আদালতে রানিমা'র উকিল পেশ করলেন দলিল। গ্যারিসন অফিসারের মঞ্জুর করা দলিল। রাজচন্দ্র দাসকে রাস্তা করার জন্যে আর্মি ওই জমি দিয়েছিলেন। রাসমণি বলে পাঠালেন, 'আমার খাসের রাস্তা, আমার যা ইচ্ছা, আমি তাই করব। সরকার বাধা দিলে যে খরচে রাস্তা করিয়েছি তার দ্বিগুণ খরচে রাস্তা উচ্ছেদ করব।' তবুও সরকারি আদেশ অমান্য করার অপরাধে ৫০ টাকা জরিমানা।
রানিমা জরিমানা জমা দিলেন, তারপর, বড়ো বড়ো, মোটা মোটা গরান কাঠ দিয়ে জানবাজারের বাড়ি থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তার দুধার দৃঢ়ভাবে বেড়া দিয়ে আটকে দিলেন। অন্য রাস্তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। কি হচ্ছে বোঝার আগেই কাজ শেষ। রানিমার কর্মীরা এতটাই তৎপর, এবং তাঁদের সংখ্যা। ইংরেজ সরকার এইবার কী করবে করো। ইংরেজি ভাষারই প্রবাদ – ‘টিট্ ফর ট্যাট্। প্রথমে এল কড়া আদেশ, ‘রাস্তা খুলে দাও।' কড়া উত্তর, 'জায়গাটা আমাদের, রাস্তাটাও আমাদের তৈরি, বেড়াটাও আমাদের, সরকারের আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না। তবে আমার রাস্তা যদি সরকারের প্রয়োজন হয়, আমাকে উচিত মূল্য দিলে রাস্তা খুলে দোবো, নচেৎ নয়।
সরকারের হম্বিতম্বি চুপসে গেল। এইবার অনুরোধ না চাইতেই জরিমানার টাকাও ফেরত এল। সরকার বুঝে গেলেন, এই নারীর শক্তি ও বুদ্ধিকে সমীহ করে চলতে হবে। একাই একশো। এঁর কাছে বারেবারে পরাজয়। রানি বাবুঘাটের রাস্তা নিজের খাসে রেখেও সাধারণের ব্যবহারের জন্যে বেড়া খুলে দিলেন। আবার তাঁর জয়জয়কার। তাঁর নামে এই ছড়াটি লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল
“অষ্ট ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ায় রানি রাসমণি।
রাস্তা বন্ধ করতে পারলে না কোম্পানি।।'
১৮৫৭ সাল। সিপাহি বিদ্রোহের কাল। ইংরেজদের নড়েচড়ে বসার কাল। বড়োসড়ো এক ধাক্কা। রানিমা রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি খুব ভালো বুঝতেন। তিনি জানতেন এদেশ থেকে ইংরেজদের সহজে হটানো যাবে না। তাদের রাজবুদ্ধি প্রবল। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে ক্যান্টনমেন্টে সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডের বিদ্রোহ সারা ভারতে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। বহু ক্ষয়ক্ষতি, মৃত্যু, দমন-পীড়ন। এই সময় অনেকেই কোম্পানির কাগজ (শেয়ার) বিক্রি করে দিতে লাগলেন; কারণ ইংরেজ কোম্পানির আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। রানিমার পরামর্শদাতারা বললেন আপনিও এইবেলা সব শেয়ার বিক্রি করে দিন। কিন্তু দূরদৃষ্টিসম্পন্না রাসমণির বদ্ধমূল ধারণা ছিল, এই বিক্ষিপ্ত এবং ধর্মীয় বিভ্রান্তিকর বিদ্রোহের ফলে ইংরেজ কোনোমতেই ভারত ত্যাগ করে চলে যাবে না।
রানিমার ভবিষ্যৎ দর্শন সত্য হলো। বিদ্রোহ স্তিমিত হলো। কোম্পানির আমল শেষ হলো। ১৮৫৮ সাল ইংল্যান্ডেশ্বরী মহারানি ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করলেন। ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম হলো। সমগ্র ভারতে কড়া শাসন। দেশের স্থানে স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করে গোরা সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এইরকম একটি সেনা ব্যারাক হলো রানিমার বাড়ির কাছে ফ্রিস্কুল স্ট্রিটে। সৈন্যসংখ্যা প্রায় ২০০/২৫০। বেশিরভাগই অশিক্ষিত, দুর্ধর্ষ, অবাধ্য। মাথার ওপর একজন মাত্র অধিনায়ক – Officer Commanding। বিদ্রোহ শেষ। কিছুই যখন করার নেই এই দুশো, আড়াইশো বন্দুকধারী কী করবে? মাতাল অবস্থায় প্রকাশ্য রাজপথে লোকজনের ওপর অত্যাচার, কখনো কখনো দোকানে, দোকানে, বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে অবাধ লুটপাট।
ঘটনাটা ঘটল এক সন্ধ্যায়। কয়েকজন মাতাল সৈন্য জানবাজারের পথে রানিমা'র বাড়ির সামনে এক নিরীহ পথচারীর ওপর অকারণে বল প্রয়োগ করছিল। রাসমণিদেবীর দারোয়ানেরা তাদের বাধা দেয়। তারা তখন জোর করে রানিমার প্রাসাদে ঢোকার চেষ্টা করলে, দারোয়ানরা তাদের মেরে তাড়িয়ে দেয়। একজন গোরা সৈন্যের মাথাও ফাটে। তারা এইবার ঘাঁটিতে গিয়ে প্রায় ৫০/৬০ জন উন্মত্ত সেনাকে নিয়ে ফিরে এল। হাতে খোলা তরোয়াল। শুরু হলো তাণ্ডব। দারোয়ানেরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারোয়ালের আঘাতে দুজনের প্রাণ গেল। বাড়িতে সেই সময় পুরুষরা কেউ নেই।
গোরাদের তাণ্ডবের খবর পেয়ে রাসমণিদেবী বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বাড়ির মেয়েদের ও শিশুদের মান্নাবাবুদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। এইবার নিজে ধরলেন রণরঙ্গিণীর মূর্তি। হাতে ঝলসাচ্ছে খোলা
তরোয়াল। অন্দরমহলের গৃহদেবতা রঘুনাথজির মন্দিরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। গৃহদেবতাকে জীবন বিসর্জন দিয়ে রক্ষা করবেন। ওদিকে ভাঙচুর, লুটপাট চলেছে। বাড়ির পোষা পাখিগুলোকেও কেটে টুকরো টুকরো করেছে। বিশ্বস্ত ভৃত্য গোবিন্দের কোমরে তরোয়ালের কোপ মেরেছে। সে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। এরপর গোরা সৈন্যরা রাসমণিদেবীর ভৈরবী মূর্তির মুখোমুখি। কেউ কেউ মন্দিরের দিকে এগোবার চেষ্টা করলে রাসমণিদেবীর তরোয়ালের আঘাতে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এর পরে রাত দশটা নাগাদ জামাতা মথুরামোহন বাড়ি ফিরে এই ভয়ঙ্কর কাণ্ড দেখে স্থানীয় কলিঙ্গবাজারে গিয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে নিয়ে গোরাদের ফ্রিস্কুল স্ট্রিটের ডেরায় হাজির হলেন। তাদের অধিনায়ক ও আরো কিছু সৈনিককে নিয়ে জানবাজারের বাড়িতে এলেন। কম্যান্ডিং অফিসারের হুঙ্কারে সব শান্ত হলো। রাসমণিদেবী সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করলেন।
এক জীবনে এত সৎকর্ম ! বহুবিবাহ সেকালের সামাজিক ব্যাধি। এই কুলীন প্রথা বন্ধের জন্যে আন্দোলন চলছিল। রাসমণিদেবী এই আন্দোলনের পক্ষে তৎকালীন ব্যবস্থাপক সমাজে বহুবিবাহ রোধের একটি আবেদনপত্র পেশ করেন। তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের তালিকা দীর্ঘ। যেমন, সুবর্ণরেখা নদীর পরপার থেকে বহু অর্থব্যয়ে তীর্থযাত্রীদের জন্যে পুরী পর্যন্ত প্রশস্ত পথ তৈরি, জন্মস্থান কোনা গ্রামে একটি স্নানঘাট নির্মাণ, নিমতলা মহাশ্মশানে গঙ্গাযাত্রীদের জন্যে বহু টাকায় প্রাসাদতুল্য ঘাট নির্মাণ। আরো অনেক ঘাট – কালীঘাটের আদি গঙ্গায়, বাবুগঞ্জ। টোনার খাল খনন করিয়ে মধুমতী নদীর সঙ্গে গঙ্গার সংযোগসাধন। বেলিয়াঘাটা ও ভবানীপুরে বাজার স্থাপন। বিভিন্ন কলেজে অর্থ সাহায্য।
সব কাজের সেরা কাজ, তিনি মন্দির হয়ে গেলেন। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির। যে উদ্যানে ঘটবে বাংলার নবজাগরণ। সেই ভাবান্দোলনের প্রবাহ ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র বিশ্বে। কালের ইতিহাসে তাঁর নাম জ্বলজ্বল করবে। ১৮৪৭ সাল, তিনি কাশী যাবেন। নৌবহর প্রস্তুত। তিনি স্বপ্নাদেশ পেলেন। কাশীতে কাশী থাক, এই গঙ্গার তীরে আমি তোমার পূজা নেবো। বারাণসী যাওয়ার জন্যে কলকাতার ঘাটে পঁচিশটি বজরা সুসজ্জিত ছিল। সেইসময় বঙ্গদেশে ঘোর দুর্ভিক্ষ ও মহামারির কবলে। রানিমার আদেশে বজরায় মজুত সমস্ত খাদ্য-দ্রব্য দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হলো।
রাসমণিদেবী জামাতা মথুরামোহনকে স্থান নির্বাচন ও দেবালয় নির্মাণের ভার অর্পণ করলেন। জমি পাওয়া গেল দক্ষিণেশ্বরে ভাগীরথী তীরে। সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বারুদাগারের দক্ষিণে, কলকাতা সুপ্রিমকোর্টের এটর্নি জেমস হেস্টি সাহেবের দোতলা কুঠিবাড়িসমেত সাড়ে চুয়ান্ন বিঘা জমি ছিল। ৪২ হাজার (৫০০ টাকায় এই সম্পত্তি কেনা হলো। পূর্বদিকে কাশীনাথ চৌধুরিদের জমি, পশ্চিমে গঙ্গা, উত্তরে সরকারি বারুদখানা, দক্ষিণে জেমস হেস্টির কারখানা। এই বিশাল উদ্যানটির পূর্ব মালিক ছিলেন জন হেস্টি। নাম ছিল "সাহেবান বাগিচা'। তিনি কুঠিবাড়িতে বাস করতেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এখানে একটি চটকল করবেন। কলের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিলেত যাওয়ার পথে জাহাজেই তাঁর মৃত্যু হলো। জেমস হেস্টি তাঁর এটর্নি। রানীমা তাঁর কাছ থেকেই এই সম্পত্তি কিনলেন। মুসলমানদের কবরডাঙ্গা, গাজিপিরের স্থান, পুষ্করিণী, আমবাগান সবই ঢুকে গেল রানিমার সম্পত্তির মধ্যে। জমিটি 'কর্মপৃষ্ঠাকৃতি। শাস্ত্রমতে শক্তিমন্দির প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম স্থান।
এই বিরাট বিষয়টি কেনা হলো ১৮৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। সেই বছরেই শুরু হলো মন্দির নির্মাণের কাজ দায়িত্বে তৎকালের নামকরা বিলিতি ঠিকাদারি সংস্থা 'ম্যাকিনটস অ্যান্ড বার্ন। এই মন্দির নির্মাণে সময় লেগেছিল ৭/৮ বছর। নির্মাণকাজ শেষ হলো ১৮৫৪ সালে। অনেক শাস্ত্রীয় বাধা বেরিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা হলো ১৮৫৫ সালের ৩১ মে (১২৬২ বঙ্গাব্দ ১৮ জৈষ্ঠ্য, স্নান যাত্রার দিন)। বিরাট, বিপুল, অভাবনীয় সমারোহ। অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য নবদ্বীপ, ভট্টপল্লী, মূলাজোড়, নোয়াখালি, বিক্রমপুর, চট্টগ্রাম, কাশী, পুরী, পুনা, মাদ্রাজ, কনৌজ, মিথিলা থেকে লক্ষাধিক ব্রাহ্মণ এসেছিলেন।
দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া যাবে না, কারণ রাসমণি ব্রাহ্মণ নন- এই ছিল সেকালের হিন্দুশাস্ত্রের ফরমান। স্বপ্নাদিষ্ট রানিমাতা এই বিধান মানবেন কেন? মন্দির নির্মাণের শুরুর দিন থেকে তিনি ব্রতধারী। তাপসীর জীবন ধারণ করেছেন। কঠোর নিয়মে-নিষ্ঠায় নিজেকে বেঁধেছেন। শেষমুহূর্তে সমাধানের পথ বের করে দিলেন। কামারপুকুরের পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। প্রতিষ্ঠার দিন রামকুমারই দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করলেন। রানি রাসমণি মহানন্দে, পরম উৎসাহে ‘অন্নদানযজ্ঞ' করলেন। সেই আয়োজন কেউ কখনো শোনেনি, দেখা তো দূরের কথা। যেমন, দধি-পুষ্করিণী, পায়েস-সমুদ্র, ক্ষীরহ্রদ, দুগ্ধ-সাগর, তৈল-সরোবর, ঘৃত-কূপ, লুচি-পাহাড়, মিষ্টান্ন-স্তূপ, কদলীপত্র-রাশি, মৃন্ময়পাত্র-স্তূপ। সেই কালে মোট ন’লক্ষ টাকা খরচ হলো।
মন্দির প্রতিষ্ঠার আগের দিন থেকেই শুরু হয়েছিল নানা উৎসব যাত্রা, কালীকীর্তন, ভাগবত পাঠ, রামায়ণ গান। উৎসবের দিন দাদা রামকুমারের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উৎসব-রাত্রির বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বিরামহীন আনন্দ। অসংখ্য আলোকমালায় দেবালয়ের সর্বত্র দিনের মতো উজ্জ্বল, রানি যেন রজতগিরি তুলে এনে এখানে বসিয়ে দিয়েছেন।
এই মন্দির, মন্দির সংলগ্ন উদ্যানের পঞ্চবটীতে শুরু হবে আর কয়েকদিন পরেই শ্রীরামকৃষ্ণের যুগান্তকারী সাধনা, 'যত মত তত পথ'। ইংরিজি শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত উচ্চবংশীয় একদল যুবক সাধক, অবতার পরমহংস শ্রীশ্রীরামকৃয়দেবের আহবানে সাড়া দিয়ে এই দেবালয়ে আসবেন। এই তপোভূমি থেকেই উদিত হবেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করবেন ভারতধর্ম। প্রবক্তা যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ। এই মন্দির সব কর্মকাণ্ডকে ম্লান করে দিয়ে হয়ে উঠবে অনির্বাণ এক শিখা। দক্ষিণেশ্বর, মা কালী, রানি রাসমণি, মথুরামোহন, শ্রীরামকৃষ্ণ এক অদ্ভুত সংযোগ। কি না হবে এই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। রানিমাতার অন্যতম জীবনীকার শ্রদ্ধেয়। বঙ্কিমচন্দ্র সেন লিখলেন, 'দক্ষিণেশ্বর নিত্যতীর্থ, ব্যক্ততীর্থ, শুধু ভারতের নয়, জগতের মহাতীর্থে পরিণত হয়েছে। লোকমাতা শ্রীশ্রীরানি রাসমণি ও শ্রীরামকৃয়দেবের আবির্ভাব যুগান্তকারী ব্যাপার। রানিমা যুগদেবীস্বরূপে
ও ঠাকুর যুগাবতার-স্বরূপে আসিলেন এবং দক্ষিণেশ্বরের শ্রীমন্দিরে উভয়েই দিব্যলীলার মাধুর্য প্রকট করিলেন... ঠাকুর বলিতেন রানিমা বিশ্বজননী জগদম্বা। ধরাধামে তাঁহার লীলা বিস্তার করিবার জন্যই আসিয়াছিলেন। দক্ষিণেশ্বর দেবোত্তর এস্টেটের পক্ষে গোপীনাথ দাস লিখছেন, 'দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রানি বিশেষভাবে ধর্ম-কর্ম ও পূজার্চনা নিয়েই দিন কাটাতেন। জমিদারি দেখাশোনার ভার জামাতাদের। জানবাজারের বাড়িতে বেশি থাকতেন না। অধিকাংশ সময়েই কখনো একা, কখনো বা সপরিবারে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরেই কাটাতেন।
'দাদার পরলোকগমনের পর (তিনি মাত্র এগারো মাস এই নতুন মন্দিরে পুজারির দায়িত্ব সামলেছিলেন) রামকৃয়দের পূজারি হলেও রানিমা রামকৃয়দেবের মধ্যে অসাধারণ ধর্মভাব দেখে তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধাভক্তি করতেন, নিকটে বসে ধর্মকথা শুনতেন। অনেক সময় আবার রামকৃষ্ণদেবের মুখে ভজন ও অন্যান্য ধর্মসংগীত শুনতেন। রামকৃষ্ণদেব রানির মধ্যে অপরিসীম ধর্মভাব দেখে তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলতেন, 'রানিমা দেবীর অষ্ট সখীর একজন।'
জমজমাট একটি জীবন। কর্মে, ধর্মে, সেবায়, জনহিতে সম্পূর্ণ নিবেদিত এক প্রাণ। এইবার বুঝি যাওয়ার সময়
হলো। সবটা দেখা হলো না। দক্ষিণেশ্বর রইল, রইলেন মা ভবতারিণী তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে, রইল রূপোর রথ,
সবই হবে যেমন হতো দোল দুর্গোৎসব। থাকবেন না রানি রাসমণি। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৬১ সাল (১২৬৭ বঙ্গাব্দ,
৯ ফাল্গুন), রাত্রে কালীঘাটের বাগানবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, কালীপদ অভিলাষী শ্রীরাযমণি দাসি'।
এই ছিল তাঁর সিলমোহর RAUS MONEY DOSSI / কালীপদ অভিলাষী শ্রীরামণী দাসি।
